25/06/2026
মেসি না রোনালদো? আরও ডেটা দিয়েও কেন এই তর্ক কখনো শেষ হবে না
শেয়ারড রিয়েলিটির নীরব মৃত্যু — আর যে অ্যালগরিদমগুলো সেটাকে কবর দিয়েছে।
আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় তর্কটা একবার মীমাংসা করতে গেলেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ে। খেলাটা নিয়ে আমাদের হাতে আগে কখনো এত ডেটা ছিল না — এক্সপেক্টেড গোলস, প্রোগ্রেসিভ ক্যারি, প্রেস, বল রিকভারি, প্রতিটা টাচ মাপার জন্য আস্ত আস্ত কোম্পানি দাঁড়িয়ে গেছে — অথচ “মেসি না রোনালদো?” প্রশ্নটার মীমাংসা আজ আগের চেয়ে আরও অসম্ভব মনে হয়। বেশি সংখ্যা বেশি ঐকমত্য আনেনি। এনেছে আরও সুন্দরভাবে সাজানো অমিল।
এই প্যারাডক্সটা আসলে ফুটবল নিয়ে না। গত দুই দশকে আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটার ছোট্ট, দৃশ্যমান উপসর্গ এটা — এমন একটা পরিবর্তন, এত গভীর আর এত সম্পূর্ণ, যে আমরা সেটাকে খেয়াল করাই বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা আর একটা শেয়ারড রিয়েলিটিতে থাকি না। আর যে যন্ত্রটা সেটা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, আমাদের অনেকেই সেই যন্ত্রটাই বানিয়ে জীবিকা চালাই।
যে পানিটা আমরা আর দেখি না
একটা পুরোনো কথা আছে — মাছই সবার শেষে পানি আবিষ্কার করে। যে পরিবর্তনগুলো আমাদের সবচেয়ে গভীরে বদলে দেয়, সেগুলোই সবচেয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। কারণ কোনো কিছু একবার “স্বাভাবিক” হয়ে গেলে, আমরা সেটাকে আর পরিবর্তন হিসেবেই দেখি না।
আধুনিক ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে একটা সমাজ ঘটনার মোটামুটি একটাই সংস্করণ শেয়ার করত। একটা দেশ একই সন্ধ্যার খবর দেখত, একই সকালের পত্রিকা খুলত, একই কয়েকটা ঘটনা নিয়ে একই ডিনার টেবিলে তর্ক করত। তথ্য ছিল দুর্লভ, আর বিতরণ ছিল কেন্দ্রীভূত। আমাদের ভাষায় বললে, সমাজ চলত একটা single source of truth-এর কাছাকাছি কিছুর ওপর — একটাই মূল, সম্পাদকের হাতে সাজানো ডেটাসেট, যেটা প্রায় সবাই কোয়েরি করত।
সেই পৃথিবীটা আর নেই। কমছে না — নেই। আর প্রায় কেউই এর শেষকৃত্যটা খেয়াল করেনি।
আর্কিটেকচারটা কীভাবে নীরবে বদলে গেল
পরিবর্তনটা ছিল আর্কিটেকচারাল। আর এখানে নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি, কারণ পুরো গল্পটাই লুকিয়ে আছে এই মেকানিজমের মধ্যে।
পুরোনো মডেলটা ছিল ব্রডকাস্ট: ওয়ান-টু-মেনি বিতরণ, যেখানে মানুষ-সম্পাদক ঠিক করত পুরো একটা অডিয়েন্স কী দেখবে। নতুন মডেলটা অ্যালগরিদমিক: ওয়ান-টু-ওয়ান বিতরণ, যেখানে মেশিন লার্নিং সিস্টেম ঠিক করে প্রত্যেকটা মানুষ আলাদাভাবে কী দেখবে। সম্পাদক অপটিমাইজ করত — অসম্পূর্ণভাবে, কিন্তু সচেতনভাবে — গুরুত্ব আর জনস্বার্থের মতো জিনিসের জন্য। অ্যালগরিদম অপটিমাইজ করে আরও সংকীর্ণ, আরও সহজে মাপা যায় এমন একটা জিনিসের জন্য: এনগেজমেন্ট। ক্লিক-থ্রু রেট, ডোয়েল টাইম, ওয়াচ টাইম, সেশন লেংথ, স্ক্রল ডেপথ। এর অবজেক্টিভ ফাংশন আপনার মনোযোগ, আপনার বোঝাপড়া না।
ফিডের নিচে বসে আছে একটা রিকমেন্ডার সিস্টেম, আর তার যুক্তিটা চমৎকার। কোলাবরেটিভ ফিল্টারিং-এর মাধ্যমে এটা শেখে যে “আপনার মতো আচরণ করা মানুষ এটাও পছন্দ করেছে” — প্রায়ই ম্যাট্রিক্স ফ্যাক্টরাইজেশন দিয়ে, যা কোটি কোটি ইন্টারঅ্যাকশনকে একটা ঘন লেটেন্ট স্পেসে চেপে ঢোকায়। আপনি পরিণত হন একটা এমবেডিং-এ — সংখ্যার একটা ভেক্টর, যেটা অস্বস্তিকর নিখুঁততায় আপনার রুচি, ভয় আর অভ্যাস বর্ণনা করে। কনটেন্ট-বেইজড ফিল্টারিং আরেকটা স্তর যোগ করে, আপনি যা দেখছেন তার ফিচারের সঙ্গে আরও একই ধরনের জিনিস মিলিয়ে দেয়।
তারপর লুপটা বন্ধ হয়। প্রতিটা স্ক্রল, থামা, লাইক, শেয়ার, রিওয়াচ — সবকিছু বিহেভিয়ারাল ডেটা হিসেবে লগ হয়ে যায়, আপনার মনোযোগ থেকে বেরোনো ধোঁয়ার মতো। সেই সিগন্যাল মডেলটাকে আবার ট্রেইন করে, মডেল আপনার ফিড নতুন করে সাজায়, নতুন ফিড আপনার পরের অ্যাকশন ঠিক করে, আর এভাবেই চলতে থাকে। কার্যত এটা আপনার ওপর চালানো রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং, কোটি কোটি একসঙ্গে চলা A/B টেস্টের স্কেলে। গবেষকরা দৃশ্যমান ফলাফলটার নাম বহু বছর আগেই দিয়েছেন: ফিল্টার বাবল, একো চেম্বার। সিস্টেমটা হোমোফিলি — একইরকমের প্রতি আমাদের টান — বাড়িয়ে তোলে, যতক্ষণ না প্রত্যেকে এমন একটা ফিডের ভেতর সিল হয়ে যায়, যা ঠিক তাকে স্ক্রল করানোর জন্যই টিউন করা।
পার্সোনালাইজেশন, তার যৌক্তিক শেষ বিন্দুতে পৌঁছালে, আপনাকে শেয়ারড পৃথিবীটার ভালো একটা ভিউ দেয় না। দেয় একটা ব্যক্তিগত পৃথিবী। একটা n=1 রিয়েলিটি।
গ্রাউন্ড ট্রুথের সমস্যা
এখানেই জিনিসটা অস্বস্তিকর হওয়া উচিত যে কারও জন্য, যে ডেটা নিয়ে কাজ করে।
আমরা যে মডেলই ট্রেইন করি, তার গ্রাউন্ড ট্রুথ দরকার — বাস্তবতার লেবেল করা, একমত-হওয়া সংস্করণ, যার বিপরীতে আমরা আমাদের প্রেডিকশন মাপি। সমাজেরও আগে একটা মোটামুটি গ্রাউন্ড ট্রুথ ছিল: তথ্য আর ঘটনার একটা সাধারণ সেট, যেটাকে বেশিরভাগ মানুষ বেসলাইন হিসেবে মেনে নিত — তা নিয়ে কী করা উচিত, সেটাতে দ্বিমত থাকলেও।
আমরা সেই ডেটাসেটটা শার্ড করে ফেলেছি। হাজারটা মেশিনে পার্টিশন করা একটা ডেটাবেসের মতো, বাস্তবতা এখন কোটি কোটি ব্যক্তিগত পার্টিশনে ভাগ হয়ে গেছে, আর আমরা প্রত্যেকে শুধু নিজেরটাই কোয়েরি করছি। আপনার ফিড আর আপনার প্রতিবেশীর ফিড একটা পৃথিবীর দুটো ভিউ না; ওগুলো দুটো আলাদা পৃথিবী। আমরা এখনো পুরোনো ধারণাটা নিয়ে চলি — “সত্য একটাই, আর আমরা সবাই সেটার দিকেই তাকিয়ে আছি” — কিন্তু নিচের আর্কিটেকচারটা আর এই ধারণাটা সাপোর্ট করে না। শেয়ারড টেবিলটা নেই। আছে শুধু শার্ড।
কেন GOAT তর্কটা কখনো শেষ হবে না
এতেই আমরা ফিরে আসি মেসি আর রোনালদোর কাছে — এই সবকিছুর সবচেয়ে নিষ্পাপ প্রমাণ হিসেবে।
ফুটবল এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিমাপ-করা ক্ষেত্রগুলোর একটা। আমরা এক্সপেক্টেড গোলস দশমিকের ঘর পর্যন্ত মাপতে পারি, একজন স্ট্রাইকারের ফিনিশিংকে তার সুযোগ-তৈরি থেকে আলাদা করতে পারি, একজন ডিফেন্ডারের প্রেসকে তার রিকভারির বিপরীতে ওজন করতে পারি। বাকি সব ডেটাসেটে আমরা যে যুক্তি খাটাই, সেই যুক্তি বলে — এত পরিমাপের তো গ্রেটেস্ট-অফ-অল-টাইম প্রশ্নটাকে একটা উত্তরের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা। উল্টো সেটা আরও দূরে সরে যায়। কেন?
কারণ তর্কটা কখনো ডেটার সমস্যা ছিল না। এটা শেয়ারড রিয়েলিটির তিনটা ব্যর্থতা, একটার ওপর আরেকটা সাজানো।
প্রথমত, দুই পক্ষ আলাদা আলাদা অবজেক্টিভ ফাংশনের জন্য অপটিমাইজ করে। এক পক্ষ মহত্ত্বকে সংজ্ঞায়িত করে শিল্প, সৃষ্টি, ড্রিবলিং, অসম্ভবকে সহজ বানিয়ে ফেলা দিয়ে; আরেক পক্ষ সংজ্ঞায়িত করে গোল, ফাইনাল, দীর্ঘস্থায়িত্ব, আর লিগ-দশকজুড়ে আধিপত্য দিয়ে। কোনো একমত-হওয়া টার্গেট ভেরিয়েবল নেই। আর যখন দুই পক্ষ এটাই ঠিক করেনি যে তারা আসলে কীসের জন্য অপটিমাইজ করছে, তখন কোনো পরিমাণ ডেটাই একজন বিজয়ী ঘোষণা করতে পারে না — সে শুধু অমিলটাকে আরও বেশি রেজোলিউশনে আবার বর্ণনা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সবাই চেরি-পিক করে। প্রতি পক্ষ সেই মেট্রিকগুলো সামনে আনে যেগুলো তাদের লোককে সুন্দর দেখায়, আর বাকিগুলো চুপচাপ ফেলে দেয় — সিলেকশন বায়াসকে ব্যবহার করা হয় একটা অস্ত্র হিসেবে। সংখ্যাগুলো উত্তর খুঁজতে ব্যবহার হচ্ছে না; ব্যবহার হচ্ছে আগে থেকেই থাকা একটা উত্তরকে রক্ষা করতে। এটা মোটিভেটেড রিজনিং-এর সঙ্গে বিগ ডেটার দেখা, আর এখানে বিগ ডেটা হেরে যায়।
কিন্তু তৃতীয় কারণটা সবচেয়ে গভীর। ছোটবেলায় যে খেলোয়াড়ের প্রেমে আপনি পড়েছিলেন, সে কখনো একটা স্ট্যাট লাইন ছিল না। সে ছিল আপনার শৈশব, আপনার বসার ঘর, আপনার বাবার ধারাভাষ্য, যে পৃথিবীটার ভেতরে বড় হতে হতে আপনি তাকে দেখেছিলেন। আপনি যখন তাকে রক্ষা করেন, আপনি একটা গোলসংখ্যা রক্ষা করছেন না — আপনি রক্ষা করছেন সেই পৃথিবীটা। আর এজন্যই তর্কটা কখনো শেষ হয় না:
আমি আপনার যুক্তি ভাঙতে পারি। কিন্তু আপনার পৃথিবীটা ভাঙতে পারি না।
দুজন মানুষ ঠিক একই সংখ্যার দিকে তাকিয়ে থেকেও দুটো আলাদা বাস্তবতায় বাস করতে পারে, কারণ সংখ্যাগুলো কখনো সেই জিনিস ছিল না যেটার দিকে তারা আসলে তাকিয়ে ছিল।
ডেটায় ঘেরা মানুষের জন্য এর মানে কী
আপনি যদি ডেটা নিয়ে কাজ করেন, এই গল্পটা স্বস্তির না, আর হওয়াও উচিত না — কারণ যন্ত্রটা আমরাই বানাই। রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন, পার্সোনালাইজেশন লেয়ার, টার্গেটিং মডেল, আর সেই ড্যাশবোর্ডগুলো, যেগুলো প্রতিশ্রুতি দেয় যে বেশি পরিমাপ মানেই বেশি সত্য।
আমাদের ক্ষেত্রের স্বস্তিদায়ক মিথটা হলো — ডেটা নিরপেক্ষ, আর বেশি ডেটা মানুষকে ঐকমত্যের দিকে টানে। মেসি-রোনালদোর তর্কটা পুরো জনজীবনের স্কেলে বড় করে দেখলে অন্য কথা বলে। ডেটা নিজে নিজেকে ব্যাখ্যা করে না। সেটা পড়া হয় পূর্বধারণার ভেতর দিয়ে, অস্ত্র বানানো হয় বাছাই দিয়ে, আর বিচার করা হয় এমন সব অবজেক্টিভ ফাংশনের বিপরীতে, যেগুলোতে আমরা খুব কমই একমত। একটা ফিডকে এনগেজমেন্টের জন্য অপটিমাইজ করে নিজেকে বলা যায়, আমরা জনগণকে তথ্য দিচ্ছি — কিন্তু গুডহার্টের সূত্র (Goodhart's Law) তার দাম ঠিকই আদায় করে নেবে: যখন কোনো পরিমাপ লক্ষ্যে পরিণত হয়, তখন সেটা আর ভালো পরিমাপ থাকে না। আমরা টাইম-অন-অ্যাপ ম্যাক্সিমাইজ করি, আর যে বাস্তবতাটা ব্যবহারকারীরা শেয়ার করতে চাইছিল, সেটাকেই ভেঙে টুকরো করি।
আমরা ডেটায় ঘেরা — আর সেটাই দিয়ে আমরা কোনোভাবে আরও দূরে সরে গেছি। আমরা সবচেয়ে দামি যে কাজটা করতে পারি, সেটা আরেকটা মেট্রিক যোগ করা না। সেটা হলো পানিটা আবার দৃশ্যমান করা: মনে রাখা, আর মনে করিয়ে দেওয়া — স্ক্রিনের একটা সংখ্যা কোনো শেয়ারড সত্য না, আর আমাদের যুগের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটা সেটাই, যেটাকে খেয়াল করা আমরা সবাই চুপচাপ বন্ধ করে দিয়েছি।
তাই যে প্রশ্নটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটা দিয়েই শেষ করি। মেসি না রোনালদো? উত্তর দেওয়ার আগে খেয়াল করি — আমরা আসলে ডেটার দিকে হাত বাড়াচ্ছি না। আমরা হাত বাড়াচ্ছি একটা পৃথিবীর দিকে। আমরা সবাই তা-ই করছি — আর যেকোনো অ্যালগরিদমের চেয়ে বেশি, এটাই কারণ যে আমরা আর একই পৃথিবীতে থাকি না।
original post link : https://www.linkedin.com/pulse/messi-ronaldo-why-more-data-never-end-debate-sadnan-mohosin-ormrc/