29/04/2026
প্রতি শনিবারই একই ঘটনা ঘটে। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এলেই আমি যেন হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাই—একদম ঠিক দুই ঘণ্টার জন্য। প্রথমে ভেবেছিলাম ক্লান্তি, তারপর ভেবেছিলাম কাকতালীয়… কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, এর পেছনে কিছু একটা আছে—কিছু অস্বাভাবিক, কিছু ভয়ের।
আমার নাম নওরীন। বিয়ে হয়েছে তিন বছর হলো রাহাতের সঙ্গে। আমরা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকি, শান্তিতে, নিজের মতো করে। কিন্তু প্রতি শনিবার দুপুরে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া—এটা যেন অলিখিত নিয়ম। রাহাতের বাবা, সোলায়মান সাহেব, অনেক বড় পদে চাকরি করেন। তার কথাই শেষ কথা।
শুরুটা খুব সাধারণ ছিল। খাওয়া-দাওয়া, গল্প, হাসাহাসি—সবই ঠিকঠাক। কিন্তু তিন মাস আগে থেকে অদ্ভুত একটা ব্যাপার শুরু হলো।
প্রথমবার যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এলাম, শরীরটা কেমন জানি লাগছিল। মাথা ঘুরছিল, চোখ জুড়িয়ে আসছিল। ভাবলাম একটু শুয়ে নিই… তারপর আর কিছু মনে নেই। জেগে দেখি ঠিক দুই ঘণ্টা কেটে গেছে।
দ্বিতীয়বারও একই ঘটনা।
তৃতীয়বারে মনে হলো—এটা আর কাকতালীয় না।
চতুর্থবারের দিনটা আমি কখনো ভুলব না।
গাড়িতে বসে ছিলাম, রাস্তায় লাইটগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। মাথা ভারী, বুক ধড়ফড় করছে।
“রাহাত… আমার খুব খারাপ লাগছে,” আমি আস্তে করে বললাম।
রাহাত এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, অন্য হাতে আমার কপালে হাত রাখল।
“জ্বর তো নেই। আবার শুরু হলো?”
তার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।
আমি কষ্ট পেয়ে বললাম, “প্রতি শনিবারই এমন হয়… শুধু ওখান থেকে ফেরার পর…”
সে হেসে উঠল। ঠাণ্ডা, অদ্ভুত এক হাসি।
“তুমি কি বলতে চাইছো? বাবা তোমাকে কিছু খাওয়ায়?”
আমি চুপ করে গেলাম। কিন্তু আমার চোখ সব বলে দিচ্ছিল।
“নওরীন, প্লিজ! এসব ভাবা বন্ধ করো। তুমি ক্লান্ত, এটাই সত্যি।”
তার কথাগুলো আমার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল।
বাসায় ফিরেই আমি সোফায় লুটিয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। ঘুম না—এটা যেন জোর করে অচেতন করে দেওয়া।
জ্ঞান হারানোর আগ মুহূর্তে দেখলাম, রাহাত আমাকে একটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। তার স্পর্শে মায়া ছিল, কিন্তু তার কথায় ছিল অবহেলা—
“অতিরিক্ত আদুরে…”
তারপর অন্ধকার।
জ্ঞান ফিরল ঠিক দুই ঘণ্টা পর।
ঘড়ির কাঁটা যেন আমার শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
সেদিন সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি সত্যিটা জানবই।
পরদিন রাহাত আর তার বাবা মাছ ধরতে গেল। আমি একা বের হলাম। শহরের এক নামী হাসপাতালে গিয়ে সব পরীক্ষা করালাম—রক্ত, প্রস্রাব, ব্রেইন স্ক্যান—যা সম্ভব সব।
কাউকে কিছু বলিনি। কোনো রেকর্ডও রাখিনি।
রিপোর্ট হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত আমি নিজেকেই সন্দেহ করছিলাম।
হয়তো আমি বাড়িয়ে ভাবছি…
হয়তো সত্যিই আমি দুর্বল…
কিন্তু রিপোর্ট খুলে পড়ার পর আমার পুরো দুনিয়া থেমে গেল।
রক্তের রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা—
“Sedative compound detected.”
অর্থাৎ—আমাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে।
ইচ্ছাকৃতভাবে।
আমার হাত কাঁপছিল। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
কে?
রাহাত?
নাকি… সোলায়মান সাহেব?
মনে পড়ল—প্রতি শনিবার একই খাবার, একই পানীয়…
আর আমি—প্রতিবার একইভাবে অজ্ঞান।
সেদিন রাতে রাহাত বাসায় ফিরলে আমি কিছু বলিনি। চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছিল, যেন কিছুই হয়নি।
আমি বুঝলাম—এটা শুধু একটা অসুখ না। এটা একটা পরিকল্পনা।
কিন্তু কেন?
আমি কি এমন কিছু জানি, যা আমার জানা উচিত নয়?
নাকি আমাকে কিছু থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে?
সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—পরের শনিবার আমি আবার যাবো।
কিন্তু এবার… আমি প্রস্তুত হয়ে যাবো।
কারণ এই গল্পের শেষটা আমি নিজেই লিখব।
#মানুষ হয়ে যায় বেইমান