21/05/2026
"সেন্টমার্টিন-সোনাদিয়া-মাতারবাড়ি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর: মার্কিন ইন্দোপ্যাসিফিক কমান্ডের বাংলাদেশ দখলের ধাপে ধাপে অগ্রযাত্রা। বন্দর-বিমানঘাঁটি মার্কিনীদের হাতে তুলে দেওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে বাংলাদেশ"
Marine Insight নামক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক (maritime) ও শিপিংভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল ১৫ই মে ২০২৬ প্রকাশ করেছে “যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে, যার ফলে আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে তার নৌযুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে পারবে।”
অন্যদিকে MILITARNYI নামক ইউক্রেনভিত্তিক একটি সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় মার্কিন সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৭ মে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দফতরের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সেই সফরে দুই দেশ ইতোপূর্বে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (ART — Agreement on Reciprocal Trade) বাস্তবায়নের শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করে।”
প্রসঙ্গত, অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে এই প্রতিবেদনগুলোর পটভূমিতে রয়েছে দুটি নির্দিষ্ট চুক্তি — ACSA (Acquisition and Cross-Servicing Agreement), যা স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমান চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়িসহ বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজে ব্যবহার করতে পারবে; এবং GSOMIA (General Security of Military Information Agreement), যা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ দেবে এবং বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশের সীমায় অবস্থান নিয়ে বঙ্গোপসাগরের অন্যদেশগুলোর অংশ (ভারত ও মায়ানমার) ও ভারত মহাসাগরের রুটে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি (চীনের পণ্যবাহী ও সামরিক জাহাজ) বিস্তৃত করবে।
এই টপিকে, বছর দেড়েক আগে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর “GSOMIA এবং ACSA চুক্তি সরাসরি নাকচ, ফলে আমেরিকার সাথে পূর্ণ দ্বৈরথ শেখ হাসিনার!” শিরোনামে আমি বিস্তারিত লিখেছিলাম কোন্ কোন্ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার উপর মার্কিন প্রশাসন ক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং ফাইনালি শেখ হাসিনাকে হত্যার নকশা এঁকেছিল।
প্রথমে ইউনুসের মাধ্যমে প্লট তৈরি করে, এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে একই ধরণের চুক্তি করতে যাচ্ছে যাতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় মার্কিন ইন্দোপ্যাসিফিক কমাণ্ডের যুদ্ধ জাহাজগুলো বাংলাদেশে অবাদে বিচরণ করতে পারে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে অবস্থান নিতে পারে। এই কাজ করার প্লট তৈরির অংশ হিসেবে 'সোনাদিয়ায় রেয়ার আর্থ মেটারিয়ালের বিপুল রিজার্ভ পাওয়া গিয়েছে এবং তা রক্ষায় মার্কিন-পাকিস্তান-তুরস্কের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় স্থান দিতে হবে মর্মে ফরমায়েশি প্রপাগাণ্ডা নিউজ বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। তখন পুরো বাংলাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম আমি ৭ নভেম্বর ২০২৫-এ "সোনাদিয়া নিয়ে নতুন ভূ-রাজনীতি: রেয়ার আর্থ রিজার্ভের মিথ্যা প্রপাগাণ্ডার আড়ালে বিদেশীদের দখল দেওয়ার চক্রান্ত" শিরোনামে একটি লেখার মাধ্যমে এই চক্রান্তের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করে আসল ব্যাপারটি জনসম্মুখে উন্মোচন করি। তখন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আমার আত্মীয়-স্বজনদের বিভিন্ন মারফতে হুমকিধামকি দেয়। এসব দুর্নীতিগ্রস্থ মিলিটারি কর্মকর্তারা জানেই না তাদের বাহিনীর প্রধানরা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পরপরই মার্কিন আমেরিকা ও কানাডায় কয়েকটি বাগান বাড়ি উপহার পেয়েছে, বউ সন্তানদের নামের বিদেশী ব্যাংক একাউন্ট গুলোতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার জমা হয়েছে, সাথে নিজে ও তার পরিবারের সকল সদস্য আগামী দশ বছরের জন্য মার্কিন আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডার ভিসা পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে সামরিক বাহিনীর এসব কর্মকর্তাদের মাসিক বেতন ও পারিতোষিক খরচ মোট কত টাকা? তারা ৮৮ হাজার ডলারের সেমিস্টার খরচে (৯০-৯৫ লক্ষাধিক টাকা / প্রতি ৪ মাস) ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়ায় কিভাবে? এর বাইরে থাকা-খাওয়ার খরচতো রয়েছেই। তাদের ছেলে মেয়েরা স্কলারশিপে বিদেশে পড়ে তাওতো নয়।
এই ক'মাসে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোটের সরকার ও জামাতের আমীর ডা. শফিকের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটের (এনসিপি সহ) কার্যক্রমে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন বিশ্ববাটপার ড. ইউনুসের রেখে যাওয়া মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাকী অসমাপ্ত কাজগুলো করার জন্যই এরা সরকারী দল ও বিরোধী দলের আসনগুলো দখলে নিয়েছে এবং এদের চালিকাশক্তির চাবি ও ফুয়েল ঢাকার বারিধারায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে; সুনির্দিষ্ট করে বললে তারেক রহমানের গুলশানের বাসার কাছাকাছি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ভাড়া নেওয়া আবাসিক ভবনের ভিতরে। সেখান থেকেই সব নাজিল হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা মহানগর জামাতের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি টক-শোতে বলেছিল 'আমাদের টার্গেট বঙ্গ ভবন ও চুপ্পু না, আমাদের টার্গেট গণভবনও না। আমাদের টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা। তার জন্য (শেখ হাসিনা) আমরা বাংলাদেশের ভিতর কোথাও মুভ করতে, মুভমেন্ট করতে পারছিলাম না। তাকে এট্যাক করা, শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দেওয়াই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল'। পাঠকবৃন্দ, আপনি চোখ বন্ধ করে মার্কিন সামরিক পোশাক পরিহিত সাদা বা কালো চামড়ার কোন অফিসারকে কল্পনা করুন এবং শফিকুল ইসলাম মাসুদের এই ডায়ালগ সেই কাল্পনিক মার্কিন সামরিক অফিসারের মুখ দিয়ে বলছে হিসেবে ভিজুয়ালাইজ করুন।
কি? কি মনে হচ্ছে? এক্সেক্টলি যা ভাবছেন তাই। এদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যারা করে তারা মূলত পাক-মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নের সৈনিক যাদের আবার ব্যাকাপ দেয় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ডলার খোর অংশ যারা সময়ে সময়ে কেজি দরে দেশ বিক্রি করে দেয় ও বিক্রি করে দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।
এবার চিন্তা করুন, কেন শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ গঠনের চেষ্টা করা হয়েছিল বা কথা তুলেছিল? কেন এখনো আওয়ামী লীগের সমর্থক দাবি করা কিছু লোক যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে মার্কিন মুলুকে উচ্চতর পর্যায়ে পড়তে যাওয়া ভেড়ার দল 'আওয়ামী লীগ থাকুক, কিন্তু শেখ হাসিনাকে চাই না' ক্যাম্পেইন সোশ্যাল মিডিয়ায় চালু রেখেছে এবং কয়েকদিন পরপর এধরণের ন্যারেটিভকে শক্তি দিতে বিভিন্ন ছ্যাবলামি প্রসব করে। কারণ, মার্কিনীরা ও তাদের এদেশীয় চাকর-নফররা জানে শেখ হাসিনা জীবদ্দশায় বাংলাদেশের ভিতর কোন বিদেশী সামরিক বাহিনীকে দখল নিতে দিবে না। শেখ হাসিনা যেকোন উপায়ে তৃণমূলের কর্মীসমর্থকদের মাধ্যমে জনগণকে সাথে নিয়ে এসব দেশ বিরোধী চক্রান্ত (বিদেশী বাহিনীর বাংলাদেশে অবস্থান) প্রতিহত করবেন যেমনটা করেছিলেন ২০০১-০৬ সালে (তখনো প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হয়েছিল 'গ্যাসের মহাসাগরে ভাসছে দেশ'। উত্তোলন করতে মার্কিনীদের বাংলাদেশে আনা প্রয়োজন ইত্যাদি)। শেখ হাসিনার ভরসা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের পোস্টেড নেতারা নয়। শেখ হাসিনার ভরসা পোস্ট পদবী বিহীন দেশ পাগল তৃণমূলের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। এসব কোটি কোটি দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষেরও ভরসা একমাত্র শেখ হাসিনায়। তারাও চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে, অন্যরা যে যাই করুক, শেখ হাসিনা বাংলাদেশটাকে বিদেশীদের দ্বারা ক্ষতবিক্ষত হতে দিবেন না।
শেখ হাসিনা এমনি এমনি বলেননি 'আমাকে ছাড়া বাকী সবাইকে কেনা যায়'। এর উদাহরণ আমরা পাই ১৯৭৫ সাল থেকে। তখনো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাক-মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঠিকাদারি নিয়েছিল খন্দকার মোস্তাকের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একাংশ, সাথে যোগ হয়েছিল অন্যান্য সংগঠনের সিআইএ এজেন্টরা।
এটা প্রমাণিত যে 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক; আর শেখ হাসিনা দেশের স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার ও জাতীয়তাবাদের মূর্তপ্রতীক ও স্তম্ভ'। আওয়ামী লীগ ওদের সমস্যা নয়, সমস্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সুতরাং 'শেখ হাসিনাকে হয় মেরে ফেলো (যেটা তারা ৫ আগস্ট ২০২৪ ও এর পূর্বে ২১ আগস্ট ২০০৪ করতে চেয়েছিল), নতুবা আওয়ামী লীগ থেকে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দাও'। এটাই পাক-মার্কিন জোট ও তাদের এদেশীয় মোল্লা-মিলিটারি-সিভিল সোসাইটি গং ও চাকর-নফরদের উদ্দেশ্য। এই কারণে বিভিন্ন স্তরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বদনাম রটিয়ে প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যাতে শেখ হাসিনা ছাড়া রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ গঠনের চেষ্টা সহজ হয়। ইতিহাস ঘেটে দেখুন - ১৯৭০ সালে মানুষ শেখ মুজিবকে (মুজিব ভাই/ শেখ সাহেব) ভোট দিয়েছিল, পুরোপুরি আওয়ামী লীগকে নয়। ৭০ এর নির্বাচনে মানুষ মুজিবকে ভোট দিয়েছে, নৌকাকে নয়। বর্তমানে শেখ হাসিনাও তাই এবং এই ব্যাপারটি ওরা (দেশী-বিদেশী ডিপস্টেট) খুব ভালমতো জানে ও বুঝে।
চৌধুরী মুজাহিদুল হক সৌরভ
পিএইচডি ফেলো, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এণ্ড জিওপলিটিক্স,