21/11/2025
ভূমিকম্প:
১. ভূমিকম্প কী? (What is an Earthquake?)
সহজ কথায়, ভূমিকম্প হলো ভূ-পৃষ্ঠের আকস্মিক কম্পন। পৃথিবীর ভূ-ত্বক (Crust) অনেকগুলো টেকটোনিক প্লেট (Tectonic Plates) দ্বারা গঠিত। এই প্লেটগুলো যখন নড়াচড়া করে, তখন তাদের সংযোগস্থলে (Fault Line) প্রচুর শক্তি জমা হয়। হঠাৎ করে সেই শিলা বা প্লেট ভেঙে গেলে বা সরে গেলে সেই জমা হওয়া শক্তি 'সিসমিক ওয়েভ' (Seismic Wave) আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটি কাঁপতে থাকে।
২. ভূমিকম্পের ফলে স্থাপনায় সৃষ্ট রিঅ্যাকশন ফোর্স
ভূমিকম্পের সময় একটি বিল্ডিং বা স্থাপনায় সরাসরি কেউ ধাক্কা দেয় না। বরং মাটি নড়ে ওঠে, কিন্তু স্থাপনাটি তার নিজের ওজনের কারণে স্থির থাকতে চায়। একে বলা হয় জড়তা বা Inertia। এই জড়তার কারণেই স্থাপনায় রিঅ্যাকশন ফোর্স তৈরি হয়।
প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে নিচে দেওয়া হলো:
* গ্রাউন্ড মোশন (Ground Motion): ভূমিকম্পের সময় মাটি ডানে-বামে এবং উপরে-নিচে (মূলত হরিজন্টাল বা আনুভূমিকভাবে বেশি) নড়তে থাকে।
* ইনার্শিয়াল ফোর্স (Inertial Force): নিউটনের সূত্রানুযায়ী (F = ma), বিল্ডিংয়ের ভরের (m) সাথে মাটির ত্বরণ (a) গুণ হয়ে একটি বল তৈরি হয়। মাটি যেদিকে সরে, বিল্ডিং তার বিপরীত দিকে একটি ধাক্কা অনুভব করে।
* ল্যাটারাল বা শেয়ার ফোর্স (Lateral/Shear Force): এই ধাক্কাটি বিল্ডিংয়ের ফ্লোর বা ছাদ থেকে কলামের মাধ্যমে নিচে নামতে চায়। ফলে কলাম এবং বিমে প্রচুর পরিমাণে শিয়ার ফোর্স (Shear Force) এবং বেন্ডিং মোমেন্ট (Bending Moment) তৈরি হয়।
* টর্শন বা মোচড় (Torsion): যদি বিল্ডিংয়ের ভরকেন্দ্র (Center of Mass) এবং রিজিডিটি বা দৃঢ়তার কেন্দ্র (Center of Rigidity) একই বিন্দুতে না থাকে, তবে বিল্ডিংটি কেবল দুলবে না, বরং মোচড় খাবে বা ঘুরতে চাইবে। এটি কলামের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
৩. স্থাপনা কেন ভেঙে পড়ে? (Failure Mechanisms)
বিল্ডিং ভেঙে পড়ার মূল কারণ হলো সৃষ্ট রিঅ্যাকশন ফোর্স বা লোড নেওয়ার ক্ষমতা স্ট্রাকচারটির না থাকা। নিচে প্রধান কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক. সফট স্টোরি মেকানিজম (Soft Story Mechanism)
আধুনিক বহুতল ভবনে প্রায়ই দেখা যায় গ্রাউন্ড ফ্লোরটি পার্কিংয়ের জন্য ফাঁকা রাখা হয় (কোনো দেওয়াল থাকে না), কিন্তু উপরের তলাগুলোতে ইটের দেওয়াল থাকে। এর ফলে গ্রাউন্ড ফ্লোরটি উপরের তলার তুলনায় নমনীয় বা দুর্বল হয়ে যায়। ভূমিকম্পের সময় সমস্ত ধকল এই দুর্বল গ্রাউন্ড ফ্লোরের কলামের ওপর এসে পড়ে এবং বিল্ডিংটি তাসের ঘরের মতো ধসে যায়।
খ. শর্ট কলাম ইফেক্ট (Short Column Effect)
অনেক সময় জানালার জন্য বা দেওয়ালের কারণে কলামের পুরো দৈর্ঘ্য ফাঁকা থাকে না, আংশিক খোলা থাকে। ভূমিকম্পের সময় এই ছোট বা 'শর্ট' অংশে প্রচুর শেয়ার ফোর্স জমা হয়, যা লম্বা কলামের চেয়ে অনেক দ্রুত কলামটিকে ফাটল ধরিয়ে ভেঙে ফেলে।
গ. বিম-কলাম জয়েন্ট ফেইলিয়র (Beam-Column Joint Failure)
একটি বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে দুর্বল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিম এবং কলামের সংযোগস্থল। যদি এখানে পর্যাপ্ত রড এবং টাই (Stirrup) ঠিকমতো না দেওয়া হয়, তবে জয়েন্টটি খুলে যায় এবং ছাদ ধসে পড়ে।
ঘ. রেজোন্যান্স বা অনুনাদ (Resonance)
প্রত্যেকটি মাটির এবং বিল্ডিংয়ের নিজস্ব একটি কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সি থাকে। যদি ভূমিকম্পের তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি এবং বিল্ডিংয়ের দুলুনির ফ্রিকোয়েন্সি মিলে যায়, তবে 'রেজোন্যান্স' ঘটে। এতে বিল্ডিংটি স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি জোরে দুলতে থাকে এবং ভেঙে পড়ে।
ঙ. লিকুইফেকশন (Liquefaction)
বালুময় বা আলগা মাটিতে ভূমিকম্প হলে মাটির কণাগুলো পানির মতো আচরণ শুরু করে। একে লিকুইফেকশন বলে। এর ফলে বিল্ডিংটি কাত হয়ে যায় বা মাটির নিচে দেবে যায় (যেমনটা জাপানের নিগাতা ভূমিকম্পে দেখা গিয়েছিল)।
সারসংক্ষেপ
ভূমিকম্পে বিল্ডিং ভাঙে মূলত হরিজন্টাল বা আনুভূমিক ফোর্সের কারণে, যার জন্য সাধারণ বিল্ডিং ডিজাইন করা থাকে না (সাধারণত বিল্ডিং শুধু গ্র্যাভিটি বা খাড়া লোড নেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়)। সঠিক ডাক্টিলিটি (Ductility) বা নমনীয়তা নিশ্চিত না করলে কংক্রিট তার নিজস্ব ভঙ্গুর (Brittle) বৈশিষ্ট্যের কারণে ফেটে গিয়ে ধসে পড়ে।