06/08/2026
একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং কিছু না-করা প্রশ্ন
Irfan Al-Hussaini ভাইয়ের সাথে আমার কোনোদিন সামনা সামনি দেখা বা কথা হয় নাই, উনার বাবা বুয়েটে আমার সরাসরি শিক্ষক, Tahmeed M. Al-Hussaini স্যার। ইরফান ভাইয়ের মরার খবর শোনার পর থেকে অনেকে কমেন্টে বার বার ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে এই মৃত্যু স্বাভাবিক না, এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। আমার তখন থেকেই ব্যাপারটা নিয়ে মনের মধ্যে খচ খচ করছিল এটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না কেন। অবশেষে আজকে ইরফান ভাইয়ের ফ্রেন্ড সার্কেলের মানুষজন ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে সম্মিলিতভাবে যেটার বেশ প্রয়োজন ছিল।
বন্ধুদের বিবৃতি অনুযায়ী, ২২ জুলাই সকালে Stanford-এর অ্যাপার্টমেন্টে ইরফান ভাইকে অচেতন অবস্থায় পান তার স্ত্রী Fabia Farlin Athena। এরপর প্রায় ৯ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর তিনি মারা যান। বলা হচ্ছে, রান্নাঘরে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
কিন্তু ওই সকালে ঠিক কী কী ঘটেছিল, সেই টাইমলাইন নিয়াই গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
ইরফান ভাইয়ের যেসব সহকর্মী তাকে আইসিইউতে দেখতে গিয়েছিলেন, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে ইরফান ভাইয়ের একটা প্রেজেন্টেশন ছিল, যেটা প্রায় সকাল ৯ টার দিকে শেষ হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি টিমের গ্রুপ চ্যাটে জানান, ‘Athe’ ভালো নেই, তাই তিনি দিনের বাকি সময় ছুটি নিচ্ছেন। বন্ধুদের পোস্টে বলা হয়েছে, তার সহকর্মীরা এর আগে ‘Athe’ নামে কাউকে চিনতেন না।
ওই বিবৃতি অনুযায়ী, Palo Alto পুলিশের রেকর্ডে ইরফান ভাইয়ের ঠিকানা থেকে সকাল প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটে 911-এ কল যাওয়ার তথ্য আছে। সেদিন সকালে Athena বাসায় ছিলেন এবং ইরফান ভাইকে যখন অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়, তখনো তিনি বাসায় ছিলেন বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
চিকিৎসকেরা নাকি জানিয়েছিলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ার কারণে ইরফান ভাইয়ের মস্তিষ্কে এমন ক্ষতি হয়েছিল, যেটা আর ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
তাই প্রশ্নগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে।
ইরফান ভাইকে অচেতন অবস্থায় দেখার পরপরই কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
911-এ কখন কল করা হয়েছিল, আর ঘটনার শুরু আসলে কখন?
সহকর্মীদের বক্তব্য, গ্রুপ চ্যাটের বার্তা, 911 কলের সময় এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, সবকিছু কি একই টাইমলাইনের সাথে মিলে?
ইরফান ভাই কি আসলেই নিজের জীবন নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?
আর যদি সত্যিই করে থাকেন, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কী এমন ঘটেছিল যে তিনি এই জায়গায় পৌঁছাইলেন?
বন্ধুদের বিবৃতি বলছে, পেশাগত ব্যর্থতা অন্তত এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বলে মনে হয় না। ইরফান ভাই কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল ছিলেন। কিছুদিন আগেই তার পদোন্নতি হয়েছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তার ওপরের স্তরের একজন ম্যানেজার প্রায় ৫০ জনের দলের মধ্যে তাকে অন্যতম প্রধান ভরসার মানুষ হিসেবে দেখতেন। কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান দরকার হইলে ইরফান ভাই সামনে এসে দায়িত্ব নিতেন।
বাইরের চোখে ইরফান ভাই আর Athena-র দাম্পত্য জীবনও ছিল অত্যন্ত সফল একটা সম্পর্কের ছবি।
২০২৪ সালের মে মাসে Georgia Tech ECE তাদের দুজনকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে তাদের পরিচয়, প্রেম, ২০২২ সালে বিয়ে, একে অপরকে পিএইচডির কঠিন সময়ে সাপোর্ট দেয়া এবং একসাথে সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার গল্প বলা হয়। ইরফান ভাই নিজের পিএইচডি ২০২৩ সালে শেষ করেছিলেন, কিন্তু Athena-র সাথে একসাথে মঞ্চে ওঠার জন্য ২০২৪ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। প্রতিবেদনে ভবিষ্যতের সফল দম্পতি হিসেবে তাদের দেখানো হয়, ইরফান ভাই NVIDIA-তে এবং Athena Stanford University-তে কাজ শুরু করবেন।
Fabia Farlin Athena নিজেও পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল একজন গবেষক। Forbes তাকে ২০২৫ সালের 30 Under 30, Energy & Green Tech তালিকায় স্থান দিয়েছিল। Forbes-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি Stanford Global Energy Fellow হিসেবে এআই হার্ডওয়্যারের বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছিলেন এবং গবেষণার জন্য প্রায় ৪ লাখ ডলারের অনুদান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই তথ্যগুলো বলার উদ্দেশ্য কারো পেশাগত সাফল্যকে ছোট করা না। উদ্দেশ্য হইলো একটা বিষয় দেখানো। বাইরে থেকে একটা সম্পর্ককে যতই সফল, সুন্দর কিংবা আদর্শ মনে হোক, সেই সম্পর্কের ভেতরে কী চলছে, আমরা সব সময় তা জানি না।
ইরফান ভাইয়ের বন্ধুদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তার বিবাহিত জীবনের অবস্থা ছিল ভয়াবহভাবে এলোমেলো। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, গত কয়েক বছরে Athena নাকি ইরফান ভাইকে তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন।
প্রায় দুই দশকের পুরোনো কাছের বন্ধুরাও বলছেন, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ইরফান ভাই হঠাৎ তাদের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তার পরিচিত ও সোশাল সার্কেলের আরও অনেকে একই ধরনের আকস্মিক সাইলেন্সের মুখোমুখি হন। বন্ধুরা বলতেসেন, এই আচরণ তাদের পরিচিত ইরফানের চরিত্রের সাথে একেবারেই মিলত না। তাদের কারো কারো মনে হইতো, যোগাযোগ করলে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া বা পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার ভয় হয়তো তার মধ্যে কাজ করতেসিলো।
বিবৃতিতে Athena-র বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অধিকার ফলানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানসিকভাবে প্রভাবিত করার আচরণের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এমনকি একাধিকবার শারীরিক হামলার গুঞ্জনের কথাও সেখানে বলা হয়েছে।
আরও একটা গুরুতর অভিযোগ আছে। বন্ধুদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের আগে একবার ইরফান ভাই সম্পর্কটা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার কথা বললে Athena নাকি নিজের জীবন নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছিল যে, Athena নিরাপদ আছেন কি না নিশ্চিত করার জন্য ইরফান ভাইকে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল।
আবারও বলতেসি, এগুলো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। তদন্ত ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত সত্য বলা যাবে না। কিন্তু অভিযোগ গুরুতর বলেই এগুলোকে চুপচাপ উপেক্ষা করাও যাবে না। পরিবার, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী, চিকিৎসক, 911 কলের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য মিলায়া একটা পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
আমাদের সমাজে পুরুষরা যে মানসিক যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যায় সেটার ব্যাপারে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না। স্টেরিওটাইপটা হলো, "ব্যাটা মানুষ সব কিছু ব্যালেন্স করে, সহ্য করে না চলতে পারলে কিসের ব্যাটা হইলি?"
পলাশ সাহার কথা আপনাদের মনে আছে? ৩৭তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তা এবং র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পলাশ সাহা ২০২৫ সালের ৭ মে নিজের অফিসকক্ষে ব্যবহৃত পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করেছিলেন। চিরকুটে তিনি লিখেছিলেন, “আমার মৃত্যুর জন্য মা এবং বউ, কেউ দায়ী না। আমিই দায়ী। কাউকে ভালো রাখতে পারলাম না।” এরপর স্ত্রী যেন স্বর্ণ নিয়ে ভালো থাকেন, দুই ভাই যেন মায়ের দায়িত্ব নেন এবং স্বর্ণ ছাড়া বাকি সম্পদ যেন মায়ের জন্য থাকে, সেই কথাও তিনি লিখে যান।
একটা মানুষ পেশাগতভাবে সফল, শিক্ষিত, দায়িত্বশীল এবং সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত হইলেই যে তার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো অসহ্য মানসিক চাপ নাই, এই ধারণা ভুল। পুরুষ মানুষ নিজের কষ্টের কথা বললে আমরা অনেক সময় তাকে দুর্বল বলি। সে চুপ থাকলে ধইরা নিই সব ঠিক আছে। আর একদিন যখন অনেক দেরি হয়া যায়, তখন সবাই জিজ্ঞেস করি, “কেউ কিছু বুঝতে পারল না?”
ইরফান ভাই যদি নিজের জীবন নিয়ে থাকেন, তাহলেও তদন্তের প্রয়োজন শেষ হয় না। বরং তখন প্রশ্ন আরও জরুরি হয়, তিনি কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন? তিনি কি কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন, নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্নতা কিংবা ভয়ভীতির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন? তার পরিবারের সাথে ও প্রায় দুই দশকের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হঠাৎ বন্ধ হওয়ার কারণ কী ছিল?
আর যদি বন্ধুদের সন্দেহ অনুযায়ী ঘটনাটা আত্ম** না হয়, তাহলে সত্য উদ্ঘাটন করা আরও জরুরি।
আমি কাউকে দোষী বলতেসি না। কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করার দায়িত্বও আমার না। সেই সিদ্ধান্ত প্রমাণ এবং তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেবে, Facebook না।
কিন্তু প্রশ্ন করা অপরাধ না।
একজন মানুষের মৃত্যু হইসে। সেই মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান অসংগতি আছে বলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা দাবি করতেসেন। পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের থেকে তার দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে অভিযোগ আছে। সম্পর্কের মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সহিংস আচরণের অভিযোগ আছে। এগুলোর পরিষ্কার উত্তর তার পরিবার, বন্ধু এবং পুরো কমিউনিটির প্রাপ্য।
কারো কাছে প্রত্যক্ষ তথ্য বা প্রমাণ থাকলে দায়িত্বশীলভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ইরফান ভাইয়ের পরিবারের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া দরকার।
ইরফান ভাইয়ের কণ্ঠ আর আমরা শুনতে পারব না। কিন্তু তার মৃত্যুর ব্যাপারে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর উত্তর চাওয়া বন্ধ করা যাবে না।
আমরা স্বচ্ছতা চাই।
আমরা পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
আমরা সত্য জানতে চাই।
© Enayet Chowdhury