26/11/2020
পতিতা পল্লী -- শেষ পর্ব
ঈদ বোনাস
আমি বুঝতে পারছি এ শহর থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া দরকার আমার। এ শহর আমাকে তিলে তিলে মেরে খাবে। গাড়ি চলছে অবিরাম গতিতে। যতক্ষন না ব্রেকে পা পড়ছে ততক্ষন চলতেই থাকবে। ছোট বেলায় শহর দেখার স্বপ্ন দেখতাম। যে শহরে রাতেও বাতি জ্বলে। যে শহরে গভীর রাতেও অনেক গাড়ি চলে। কিন্তু সেদিন বুঝিনি এ শহরে অনেক মানুষ রাস্তার পাশে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। যে শহরের প্রত্যেকটা ইট স্বার্থপরের মাটি দিয়ে তৈরী।
যে সময় একবেলা ভাত খেয়ে সারাটি দিন কাটিয়ে দিতাম তখন এতটা কষ্ট হয়নি। শুধু একটি নারী দেহ চলে যাওয়াতে যতটা কষ্ট হচ্ছে। কি রকম এক অদ্ভুদ কষ্ট কাউকে বুঝানো যায়না। বলাও যায়না। শুধু সেই ই বুঝে যার হারায়। মুনতাসির আর হাবিব বলেছিল আজকে দেখা করবে আমার সাথে। তাই ওদের কল করে নদীর পাড়ে আসতে বললাম। যে নদী আমার মন খারাপের সাক্ষী। আবার সেই গান। সেই সুর ;সেই পরিবেশ।
মুনতাসিরের ব্রেকাপের পর ও যখন চরমভাবে পাগলামি করেছিল সেদিন মনে করেছিলাম কোন ছেলেমানুষী করছে। কত বকা ঝকা করেছি। কত শান্তনা বাক্য শুনিয়েছি। পাগলামীর মাত্রা যখন চরম পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল অনেকবার গায়ে হাত ও তুলেছি। তখন মুনতাসিরকে শান্তনা দিয়ে একটি কথা বার বার বলতাম-;"যে মেয়ে নিজে থেকে চলে যায় তাকে ভেবে মিথ্যে মন খারাপ করে কি লাভ? যে চলে গেছে সে যাকনা। এরকম একটা গেলে কতটা আসবে।"
কিন্তু সেদিন কি আর বুঝেছিলাম? মুনতাসির তো হাজারটার আশা কোনদিন করেনি। ও তো একজনকে ঘিরেই সমস্ত স্বপ্ন দেখেছিল। কেন জানি মুনতাসিররা অদিতির মত হতে পারে না। ওরা চাইলেই বলতে পারে না। এরকম একটা মেয়ে গেলে হাজারটা আসবে।
মুনতাসির এখন আমার পাশে বসে আছে। আমিও ওর পাশে বসে আছি। কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছি না। কিছুক্ষন হল ও এসেছে। আসার পর আমি যখন ওকে দেখে উঠে দাড়ালাম তখন শুধু কাধে হাত রেখে বলেছে কিছু চিন্তা করিসনা; সব ঠিক হয়ে যাবে দোস্ত। আমি কিছু বলিনি। এরপর থেকেই কোন কথা ছাড়া দুজনেই সিগারেট খেয়েই যাচ্ছি। হাবিব ও এসেছে মাত্র। মুনতাসির আর হাবিব ওরা দুজনে এখন আমার সব অতীত জানে। এই নিষ্ঠুর অতীতগুলোকে আকড়ে ধরে একা বেচে থাকতে পারছিলাম না। তাই সকল ভয় সংকোচ দূরে ফেলে মনের কথাগুলো ওদের বলেই দিলাম। তিন দিক থেকে হেরে যাওয়া তিন জন মানুষ বসে আছি। আজকেও চারদিক চাঁদের আলোয় আলোকিত। সেই সুবাদে নদীতে আপন মনে যে নৌকা গুলো চলছে তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। আচ্ছা যে নদীর বুকে এত মানুষ গান ধরে তাদের মনের জ্বালা মেঠায়। সে নদীর কি কোন দুঃখ আছে? সে দুঃখের কি কোন শেষ আছে?
হাবিব আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল-"কি সিদ্ধান্ত নিলি?"
"কিসের সিদ্ধান্ত? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"ভাবীর তো নাহ সরি অদিতির তো বিয়ে হয়ে গেল। এতক্ষন এ হয়তো শ্বশুর বাড়িতেও পৌছে গেছে। ওকে নিয়ে নানা মাতামাতি শুরু হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ বৌ দেখতে আসবে। আর তারপরেই চার দেয়ালের লাইট বন্ধ ঘরে বন্দী হয়ে যাবে। অন্য জনের কাধে ভর করেই স্বপ্ন দেখা শুরু করবে"।
আমি হাবিবের দিকে তাকিয়ে আছি। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসছিল। অন্য সময় চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করতাম কিন্তু আজ তা করবনা। আজ তা সবার সামনে প্রকাশ পাক। থেমে থেমে কান্না আসছে। ভেতরের কান্নার জন্য মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। মিনিট তিনেক পরে বললাম,
-"আচ্ছা হাবিব চলনা। আজ রাতে দূরে কোথাও ঘুরতে যায়।"
-"পাগল হয়ে গেলি নাকি? আজ রাতে? হঠাৎ করে? তাও আবার এভাবে?"
মুনতাসির হাত থেকে সিগারেট একেবারে নদীর জলে ফেলে দিল। সেটি ভেসে যাচ্ছে আর হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ দূরে। আর বলল-"চলনা হাবিব। আমারো কেন জানি দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে। আর এতে হয়তো অভির ও মনটা একটু হাল্কা হতে পারে। হারানোর যন্ত্রনা আমি তো বুঝি রে দোস্ত।"
হাবিব আমার কাধে হাত রেখে বলল-"আচ্ছা ঠিক আছে। আজ রাতেই আমরা দূরে কোথাও যাচ্ছি। তবে একটা কথা শুনে রাখ অভি।"
-হুম বল।
-"আমরা কিন্তু যাচ্ছি শুধুই তোর জন্য। তুই কিন্তু মন খারাপ করে জার্নিটা ভেস্তে দিতে পারবিনা।"
হাবিবের কথা শুনে আমি হাসি দিলাম। হাবিব আর মুনতাসির ও আমার সাথে হাসছে। একেবারে বন্ধুত্বের হাসি। যে হাসিতে কোন স্বার্থপরতার ছাপ নেই। নেই কোন যান্ত্রিকতা।
দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে হলে বাসা থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। হাবিব ওর গাড়ি নিয়ে এসেছে। মুনতাসির ও সাথে গাড়ি নিয়ে এসেছে আর আমার টা তো আছেই।
_গাড়িটা কি তিনটা নিয়ে যাবি নাকি? মুনতাসির জিজ্ঞেস করল।
আমি বলে উঠলাম-"না না।আমার টা নিয়েই যাব। অফিস থেকে নতুন গাড়ি পেয়েছি তো"
সাথে সাথে হাবিব বলে উঠল-"সাব্বাস বস।"
আমি হাবিবের দিকে তাকিয়ে আবার হাসি দিলাম। হাবিব হাসছে সাথে মুনিতাসির ও হাসছে। এ হাসিতে কোন আওয়াজ নেই তবে একেবারে মমতায় ঘেরা। একারনেই মনে হয় বিখ্যাত মানুষরা বন্ধুদের সব সময় উচুতেই রাখেন। যেখানে আর কারো যাওয়ার সাধ্য নেই। সেখানে কেউ পৌছাতে পারেনা।
নদীর পাড়টা আজ কেন জানি অন্যরকম ভাবে সেজেছে। এতক্ষন চাঁদ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তবে এখন দেখা যাচ্ছেনা। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। তাই কেন জানি এখান থেকে উঠতেই ইচ্ছে করছেনা।
-অদিতির স্বামী কি করে রে? জানিস কিছু? মুনতাসির আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-"জানিনা। তবে মনে হয় বিরাট বড়লোক বাপের ছেলে। আজকে দেখে যা মনে হল।"
-সেকী! তুই আজকে বিয়ে বাড়িতে গিয়েছিলি নাকি? হাবিব জিজ্ঞেস করল।
-"অদিতিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল"এই বলে শত চেষ্টা শেষেও আর নিজেকে থামাতে পারলাম না। কোন কোন চোখের জল না চায়তেই চলে আসে। এখানে কারো হাত থাকে না।
-"আচ্ছা হাবিব রাখনা এসব কথা। এখন উঠবি চল"এই বলে হাবিব আর মুনতাসির আমাকে ধরে তুলল।তিনজন হাটছি সামনে দিকে। গাড়ি আছে পার্কিং জোনে পার্ক করা অবস্থায়। দূর থেকে ভেসে আসে এক অদ্ভুদ সুর সেই সাথে নৌকার দাড় টানার শব্দ।কেউ একজন মুক্ত গলায় গাইছে মন মাঝি তোর বৈঠানেরে আমি আর বাইতে পারলাম না। আমি আবার দাঁড়িয়ে গেলাম। হাবিব আর মুনিতাসির একসাথে জিজ্ঞেস করল "দাঁড়িয়ে গেলি কেন?"
দোস্ত গানটা শুনে তারপর যাই?
ওরা আবার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাবিব বলল-"অদিতিকে একটিবার সব সত্য বলে দেখতে পারতি। এতই যখন কষ্ট পাচ্ছিস"
হাবিব এর হাত দেখি চোখের কোনার দিকে। চোখের কোনা থেকে কি একটা মুচছে। মুখে লাইট পড়তেই দেখি চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। জল গড়ানোর ধরন দেখে মনে হচ্ছে সে অনেক্ষন ধরে কান্না করছে।
হাবিব আর মুনতাসির যে যার গাড়ি বাসায় রেখে এসেছে আর বাসায় বলেও এসেছে আজ রাতে ফিরবেনা। একথা শুনে নাকি হাবিবের বাসায় একটু ঝামেলা হয়েছিল তবে হাবিব সেটি অগ্রাহ্য করে চলে এসেছে। তিনজন এখন এক গাড়িতে। আমার গাড়িতে। গাড়ি চালাচ্ছে হাবিব। অবশ্য আমিই চালাতে চেয়েছিলাম কিন্তু হাবিব সেটা করতে দিলনা। চাবিটা ও নিজেই নিয়ে নিল। গাড়ি চলছে হাইওয়ের উপর দিয়ে অবিরাম গতিতে।
গাড়ির দরজার কাচ নামানো। আমি হাবিবের পাশের সিটে আর মুনতাসির বসেছে পেছনে। শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে। একটু পরেই এই শহরকে পেছনে ফেলে যাব।
-"অভি তোর গাড়িটা কিন্তু জোশ" হাবিব বলল।
"মাত্র পরশুদিন ই তো বের করলাম। জোশ তো একটু হবেই"-আমি বললাম।
-"অভি তুই কিন্তু স্কুলে থাকতে সব সময় বলতি বড় হলে গাড়ি কিনবি। আর সেটা শুনে আমরা সবাই হাসতাম।"মুনতাসির বলল।
-"এটা কিন্তু আমি কিনি নি দোস্ত। অফিস থেকে দিয়েছে"
-তুই নিজেই তো সবসময় বলিস আজকাল মানুষ তেলে মাথায় তেল দেয়। অফিস কোম্পানী মানুষ কোনটি তার ব্যতিক্রম না। তোর মাথার তেল দেখে ওরা গাড়ি নামক তেলটা তুকে দিয়েছে। সব ই তোর দোস্ত। তোর ঘর। তোর মা। তোর চাকরী; মুনতাসির বলল।
"আগের সব পিছুটান ভুলে আবার নতুন করে শুরু কর সব। আরেকটা বিয়ে কর। দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।"হাবিব বলল।
"জীবনটাতো কলমে লিখা কোন লাইন না দোস্ত। ভুল হলেই কেটে আবার ঠিক করে দিব।"-আমি বললাম।
-"তবে জীবনটা যে পাওয়া না পাওয়ার এক নোংরা খেলা। যার একটা অংশ সব সময় পেতে চায় আরেকটি বেচে থাকে হারানোর যন্ত্রনা নিয়ে"-হাবিব বলল।
-আচ্ছা হাবিব আসার সময় তুই নিজেই বললি এসব কথা না তুলতে। তাহলে? আমি বললাম।
হাবিব আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি আবার বললাম-"ঠিক মত গাড়ি চালা ভাই।নতুন গাড়ি আমার। খালে বিলে নামিয়ে দিস না"
হাবিব আর মুনতাসির অন্য মাত্রায় হাসছে। আমিও হাসছি ওদের সাথে। এত হাসির মধ্যেও অদিতির কথাটি কেন জানি মাথা থেকে যাচ্ছেই না। আচ্ছা অদিতি কি এখন ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি নতুন স্বামীর সাথে বসে গল্প করছে। জীবনের সব গল্প। এমন সব গল্প যা অদিতি আমার সাথেও করে নি।
কুমিল্লা পাস করেছি বেশ কিছুক্ষন হল। গাড়ি এখন কুমিল্লা টার্ন করে সিলেট যাওয়ার হাইওয়েতে।নিজেদের গাড়ি থাকার একটা সুবিধা হল ইচ্ছেমত যেখানে ইচ্ছে সেখানে থামানো যায়। প্রকৃতি দেখা যায়। আর হাবিব সেই সুবিধাটি কড়ায় গন্ডায় নিচ্ছে। ইচ্ছেমত গাড়ি থামাচ্ছে। মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় কাজে আবার মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনীয় কাজেও। গাড়ীতে সেই তখন থেকেই গান বাজছে।
সিলেট যাওয়ার পথে কুমিল্লা পর্যন্ত রাস্তা বেশ চওড়া। সে পর্যন্ত ইচ্ছেমত গাড়ি চালানো যায়। সহজেই ওভারটেক করা যায়। কিন্তু কুমিল্লা টার্ন করার পর রাস্তাটি একেবারে সরু হয়ে গেছে। ওভারটেক তো সম্ভব ই হয়না মাঝে মাঝে করতে চাইলেও তা রঙ সাইডে গিয়ে করতে হয়। তার উপর বড় বড় দানবেত বাসগুলো এমন গতিতে চলে মনে হয় যুদ্ধে যাচ্ছে। অবশ্য এত লম্বা পথ জোরে না গিয়েও উপায় কি?
আর ট্রাকগুলোকে দেখে বড্ড অসহায় লাগছে। এত বোঝা বহন করেছে যে চলতেই পারেনা।
-"আচ্ছা অভি। যদি বাসায় ফিরে কলিং বেল দিতেই দেখিস অদিতি দরজা খুলে দিল। তাহলে খুব অবাক হবি?" মুনতাসির বলল।
আমি জানি মুনতাসির নেহাৎ মজা করার জন্য কথাটি বলেছে।
-"নাহ অবাক হব কেন? অবাক হওয়ার কি আছে? তবে এসব রুপকথার গল্প আমাকে শুনাতে আসিস না।"
-হতেও তো পারে। যদি জানতে পারিস আমি আর মুনতাসির প্ল্যান করে এসব কান্ড কারখানা করেছি। তুই অদিতিকে কতটা ভালবাসিস সেটা দেখার জন্য অদিতিকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। আর অদিতিও তোকে অবাক করে দেওয়ার জন্য এ মিথ্যে খেলাটা খেলেছে। তখন কি করবি?" হাবিব বলল।
-"জীবনটাই তো সত্য মিথ্যের খেলা। কিন্তু এখন কোনটা মিথ্যে আর কোনটা সত্য সেটি বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি রে দোস্ত। সব কিছু তো মানুষ ই করে। কেউ মিথ্যে বলে আর কেউ মিথ্যে মেনে নেয়। আর অনেকে সে মিথ্যেকে আগলে ধরে বেচে থাকে। এক সময় সত্যিটা সামনে আসে।তবে এখন আমার জীবনে আর কোন কিছুই মিথ্যে নেই। আমার মা,খালা,আশরাফ,নুরজাহান আমার চাকরি এক একটা এক এক সত্যি। আমি একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম।
পেছন থেকে মুনতাসির বলল-"সত্য! মিথ্যে! আর দীর্ঘদিন ধরে তৈরী হওয়া সম্পর্কের বাধন। আবার সে বাধন ছেড়েই একসময় হারিয়ে যাওয়া। এটিই জীবন। আর সে জীবনকে বাচিয়ে রাখার যুদ্ধ। মানুষ তারপরেও কেন যে এই জীবনকে ভালবাসে একমাত্র সৃষ্টিকর্তায় জানে।"
এরপর আমি আর কিছুই বলিনি। হাবিব নিজের মত করেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। আর সিগারেট ধরিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটি নিজের তাই সিগারেট গাড়ির ভেতর খেতে পারছি। অন্যের গাড়ির ভেতর সিগারেট খাওয়া যায় না। তাতে গাড়ি গন্ধ হয়ে যায়।
হাবিব অনেক্ষন ধরেই একটি ট্রাকের পেছনে পেছনে যাচ্ছে। মাল ভর্তি ট্রাক তাই তেমন জোরে চলতে পারছেনা। ট্রাকটিকে অভারটেক করে সামনের দিকে যেতেই দেখা যায় ওপাশ থেকে একটি বাস খুব জোরে ধেয়ে আসছে একেবারে দানবের মত বাসটি হঠাৎ আমাদের সামনে এসে যায়। মুনতাসির হাবিব বলে প্রচন্ড জোরে ডাক দেয়। আমি চারদিকে অন্ধকার দেখছি তাই কিছু বুঝে উঠতে না পেরেই চোখ বন্ধ করে ফেলি। প্রচন্ড এক বিকট শব্দ। সেই সাথে বাসটি ধেয়ে যাচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরে। হয়তোবা বাচার চেষ্টায় হয়তোবা পালানোর চেষ্টায়।
রাস্তার পাশে পড়ে আছে তিনটি নিথর দেহ। তার একটু দূরেই পড়ে আছে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া একটি গাড়ি। সেই সাথে নিভে গেছে মুনতাসির অভি আর হাবিব হাবিব নামের তিনটি মানুষের প্রানের স্পন্দন; তাদের বড় হওয়ার স্বপ্ন তাদের বেচে থাকার স্বপ্ন। তিনটি দেহের প্রানের প্রদীপ নিভে গেছে ঠিকই কিন্তু চোখগুলো কেন জানি এখনো খুলে আছে। চোখগুলো এক সময় স্বপ্ন দেখেছিল আকাশ দেখবে বলে। এই স্বার্থপর বিশ্বসংসারের বিশাল কোন আকাশ। সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে আকড়ে ধরে বেচে থাকবে বলে। গভীর রাত। আকাশে জমে থাকা মেঘ সরে গেছে তাই জোছনার আলো আবার নেমে এসেছে পৃথিবীতে। হাইওয়ে ধরে চলে যাচ্ছে একের পর এক গাড়ি।
আস্তে আস্তে চারদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে। দূর থেকে ভেসে আসে এম্বুলেন্সের করুন সুর। সেই সাথে কয়েকগাড়ি পুলিশ। আমার দেহের প্রানের স্পন্দন নিভে গেছে অনেক আগে। তারপরেও কেন জানি সব দেখতে পাচ্ছি।
খাকি পোষাকধারী পুলিশ আসল। আই ডি কার্ড আর মোবাইল দিয়ে পরিচয় সনাক্ত করা হল। লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ময়না তদন্তে। ময়না তদন্তের পর ডেডবডি পাঠিয়ে দেওয়া হল যার যার ঠিকানায়। সে পথ দিয়েই ডেডবডি নিয়ে এম্বুলেন্স যাচ্ছে যে পথে কাল অনেক স্বপ্ন নিয়ে যাচ্ছিল তিন জন মানুষ। আর এম্বুলেন্সের করুন সুর তো বেজেই চলছে। দুমড়ে যাওয়া গাড়িটি নিয়ে যাওয়া হল হবিগঞ্জ থানায়।
হাবিবের লাশ গ্রহন করেছে ওর বাবা। মুনতাসিরের বাবা নেই তাই ওর মা গ্রহন করেছে। আর আমার লাশ গ্রহন করার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে আমার মা, আশরাফ আর নুরজাহান। চারদিকে কান্নার আহাজারি।
এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে বাসার সামনে। আমার ডেডবডি এখনো বের করা হয়নি। আশরাফ,মা আর নুরজাহান থেমে থেমে কান্না করছে। মা মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। নুরজাহান দায়িত্ব নিয়ে মায়ের জ্ঞান ফিরাচ্ছে।
আজ এখন মনে হচ্ছে জীবনে একেবারে হেরে গেলাম। আর সবাইকে হারিয়ে দিলাম আমার মাকেও।হঠাৎ নুরজাহানের কোলের বাচ্চা কেদে উঠে। অন্যদিনের সাথে আজকের কান্নার কেমন জানি আকাশ পাতাল পার্থক্য। নুরজাহান বলে উঠে-"কান্না করিস না অভি। তোকে তো অনেক কিছুই সহ্য করতে হবে। বড় হতে হবে।"অভি নামটি শুনতেই মা ওর দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকে।
আর নুরজাহান মায়ের দিকে তাকিয়ে কান্না করতে করতে বলে-"হ খালা। আমি আমার পোলার নাম অভি ই রাখব। ওকে আজ থেকে অভি বলেই ডাকব। তোমার হারিয়ে যাওয়া অভির মতই আমার অভি বড় হবে।"
চারদিকে কান্না আর কান্না। চিতকার করে কান্না। থেমে থেমে কান্না। আবার নীরবে কান্না। এত কান্না কোনদিন শুনিনি। সবাই আমার জন্যই কাদছে। একটি জারজ সন্তানের জন্য।
মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অফিসের অনেক কলিগ এসেছে। সবার চোখে জল। কেউ কেউ আবার মাকে দেখে অবাক হচ্ছেন আবার সেটা নিয়ে হাসাহাসিও করছেন। মানুষ ই তো সব করে।
লাশ দাফন করে সবাই যে যার মত চলে গেল। বাড়িটা অফিস থেকে দিয়েছিল তাই অফিস নুরজাহান আর মাকে বাড়ি ছাড়ার চিঠি দিয়ে গেল।
সবার কান্না থেমে গেলেও মার আর নুরজাহানের কান্না এখনো আছে। বাড়ি ছাড়ার জন্য কাপড় চোপড় গুছানোর সময় কান্না। মাঝে মাঝে জানালা ধরে কান্না।
হাবিব আর মুনতাসিরের বাড়িতেও বইছে ভারী বাতাস। আর্তনাদ আর চারদিকে কান্নার সুর।
পরের দিন পত্রিকার হেডলাইন।
"সড়ক দূর্ঘটনায় তিনজনের প্রানহানি।"
অদিতির শ্বশুর বাড়িতে এখনো আছে বিয়ের আমেজ। সেই আমেজের মাঝেও অদিতির পত্রিকায় চোখ বুলাতে ভুল হয়নি। পত্রিকায় আমার ছবি দেখতেই মেয়েটির নজর যায় সেদিকে। পরক্ষনেই পত্রিকার স্পষ্ট জলের ছাপ কিছু লেখাকে একেবারে ভিজিয়ে দেয়। পত্রিকা রেখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ও। দূর দূরান্ত থেকে অনেক বড় বড় মানুষ এসেছে অদিকিকে দেখতে। সেদিকে কেন জানি মন দিতে পারছে না ও। কি যেন ভাবছে জানালা ধরে। একেবারে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। অন্যসময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ও আকাশ দেখে। কিন্তু আজ তা করছেনা।
আশরাফ এসেছে মা আর নুরজাহানকে নিয়ে যেতে। মানুষগুলোর ঠাই হলনা কোথাও। ঐ পতিতা পল্লী ছাড়া। এ সমাজ ওদের ঠাই দিলনা। নুরজাহান আমার ডায়েরিটা নিতে একটু ও ভুল করে নি।
বেশ কয়েকদিন পর।
সবাই সব কিছু ভুলে গেছে। আশরাফ নিয়মিত অফিস করছে। বড় হচ্ছে নুরজাহানের ছেলে।নুরজাহান ওর নাম রেখেছে অভি। শুধু মা মনে হয় এখনো কিছু ভুলতে পারেনি। সবসময় জানালা ধরে কি যেন ভাবে। আর নীরবে কান্না করে। আবার মাঝে মাঝে চিৎকার করে কান্না করে। নুরজাহান প্রতিদিন একবার করে ডায়েরিটা বের করে আর পড়ে। আশরাফ মাঝে মাঝে চায় অদিতিকে গিয়ে সব সত্যি বলে দিতে। কিন্তু সেটি আর করে না।
অদিতি শ্বশুর বাড়িতে স্বামী নিয়ে সুখেই আছে। তবে এখন আর স্বামীর সাথে রাত জেগে জোছনা দেখে না।
কেমন জানি হয়ে গেছে মেয়েটি।
কার্টেসি salman jico
ধন্যবাদ সবাই কে।