07/02/2026
সকালবেলা যখন ফেসবুক স্ক্রল করা হয়, তখন দেখা যায় সরকারি চাকুরি করা বন্ধুরা পরিবারের সাথে লেকের পাড়ে ঘুরছেন কিংবা আয়েশ করে নাস্তা করছেন। ঠিক সেই একই সময়ে বেসরকারি খাতের কর্মীদের লোকাল বাসের ভিড়ে ঘামতে ঘামতে অফিসের দিকে ছুটতে হচ্ছে।
হ্যাঁ, আজ শনিবার। বেসরকারি খাতের হাজার হাজার কর্মীর কাছে এই দিনটিকে সপ্তাহের সবচেয়ে 'অভিশপ্ত' এক দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
________________________________________
১. বৈষম্য যখন প্রাতিষ্ঠানিক
বাংলাদেশে সরকারি অফিস সপ্তাহে দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) বন্ধ রাখার বিধান রয়েছে। অথচ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সিংহভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি প্রদান করা হয়। প্রশ্ন জাগে—বিশ্রাম কি শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য বরাদ্দ? নাকি বেসরকারি খাতের মানুষের শরীরের ক্লান্তিকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না?
২. পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
শনিবার যখন সন্তানদের স্কুল বন্ধ থাকে এবং জীবনসঙ্গী ঘরে থাকেন, তখন বেসরকারি চাকুরিজীবীকে অফিসে পড়ে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে পরিবারের সাথে সুন্দর সময় কাটানোর সুযোগটুকু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এর অবধারিত ফল হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে বাড়ছে হতাশা আর মানসিক দূরত্ব।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
টানা ছয় দিন কাজ করার পর মাত্র এক দিনের ছুটিতে শরীর আর মনের ক্লান্তি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না। রবিবারে যখন নতুন সপ্তাহ শুরু হয়, তখন বেসরকারি কর্মীদের ডেস্কে বসতে হচ্ছে চরম ক্লান্তি নিয়ে, কোনো মানসিক প্রশান্তি ছাড়াই। এই 'বার্নআউট' দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করা হয়।
৪. যানজট আর জনভোগান্তি
সরকারি অফিস বন্ধ থাকায় রাস্তা কিছুটা ফাঁকা থাকার প্রত্যাশা করা হলেও, বেসরকারি অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় যানজটের তীব্রতা খুব একটা কমছে না। ফলে ছুটির দিনের আমেজ তো পাওয়া যায়ই না, বরং যাতায়াতেই মূল্যবান সময়ের বড় একটা অংশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে।
"বেসরকারি কর্মীদের কি স্রেফ করপোরেট স্লেভ হিসেবে দেখা হচ্ছে? যেখানে উৎপাদনশীলতার দোহাই দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে তুচ্ছ করা হয়?"
________________________________________
প্রত্যাশা ও আবেদন:
বেসরকারি খাতের কর্মীদেরও সপ্তাহে দুই দিন বিশ্রাম পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
• মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হোক: দুই দিন ছুটি নিশ্চিত করা হলে কর্মীরা আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
• বৈষম্য দূর করা হোক: সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মঘণ্টা ও ছুটির ব্যবধান কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
• সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: পর্যাপ্ত বিশ্রাম কর্মদক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে, এটি এখন স্বীকৃত সত্য।
বাংলাদেশে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের মধ্যে ছুটির এই বিস্তর ফারাক দীর্ঘদিনের এক অমীমাংসিত কষ্টের নাম। একদিকে সরকারি কর্মকর্তারা টানা দুদিন ছুটি কাটিয়ে সতেজ হয়ে কাজে ফিরছেন, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মীরা শনিবারের যানজট আর কাজের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন।
বেসরকারি খাতের এই নীরব আর্তনাদ যেন নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছায়। সবারই পরিবার আছে এবং সবারই বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।