13/08/2025
একটা আনপপুলার অপিনিয়ন
সাদাপাথর লুটের ঘটনায় সবাইকে দেখলাম পর্যটন সৌন্দর্য্য নষ্টের জন্য আফসোস করতে।কিন্তু এই ঘটনা কেন ঘটেছে তার ভিতরের খবর নিয়ে কেউ লিখবে না।
আপনারা যেইটা সাদাপাথর নামে ২০১৭ এর পর থেকে চিনেন এইটা আগে থেকেই ছিল স্থানীয়রা আমরা সেটাকে বিডিআর ক্যাম্প নামেই জানতাম।ভাইরাল হওয়ার পরই এই জায়গার নাম সাদাপাথর রাখা হয়।
তখন এই জায়গা অরক্ষিত ছিল তবুও কেউ পাথর লুট করত না কারন তখন প্রতি বছর ধলাই নদীতে কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলন করা হত। এক বছরে পাথর উত্তোলন করা কোয়ারিতে পুনরায় ২/৩ বছরে বন্যার পানিতে ভারত থেকে পাথর ফ্রিতে এসে ভরে যেত। সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ অনেক এলাকার মানুষ এসে কোয়ারিতে ২ থেকে ৩ মাস কাজ করে সারাবছরের জীবীকার ব্যবস্থা করে ফেলত।
আর এই পাথর নদী থেকে ক্রাশার মিলে নিয়ে পাথর বিভিন্ন সাইজে ভেংগে ঢাকাসহ সারদেশের অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যবহার করা হত, এমনকি আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানিও করা হতো।
উত্তোলন থেকে শুরু করে একেবারে নির্মাণশিল্পে ব্যবহার পর্যন্ত এই শিল্পে কত লক্ষ মানুষের জীবীকার যোগান ছিল তা কেউ হিসেব নেয় নি।নৌকা শ্রমিক,লেবার, ট্রাক্টর,ক্রাশিং মিল,লোডিং লেবার,ট্রাক,ট্রান্সপোর্ট, আনলোড লেবার এসব কাজে বিশাল মানুষের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহন ছিল। কত শত উদ্দ্যোক্তা পথে বসেছে তার কি কেউ হিসেব নিয়েছে?পর্যটন কেন্দ্র করার পর থেকে সবকিছু আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেছে।
সাদা পাথরে যাওয়ার সময় অবশ্যই দেখে থাকবেন কোম্পানিগঞ্জের পথে পথে অগনিত পাথর কোয়ারির কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে,শত কোটি টাকার এসব ক্রাশিং মিল তার কংকাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময়ের প্রাণচঞ্চল জনপথের প্রতিটা বাজার একাকীত্ব নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে, এলাকা কর্মক্ষম পুরুষশূন্য হয়ে গেছে। একটা অর্থনৈতিক কর্মাঞ্চল নিঃস্ব হয়ে লাখ লাখ মানুষের কাজের জায়গা বিরান ভূমিতে পরিনত হয় শুধুমাত্র উপরমহলের দূরদর্শিতার অভাবে।
সিলেটের বাইরের উদ্দ্যোক্তারা আস্তে আস্তে কুলিয়ে উঠতে না পেরে লস মেনে যে যেখানে পারে চলে যায় কেউবা অন্য পেশায়,কেউবা বিদেশে চলে যায়। কিন্তু কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট,ছাতক এবং সুনামগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অঞ্চলের মানুষ যারা পাথর উত্তোলনের কাজ করত তারা খুবই মানবেতর দিন কাটাতে লাগল।
সিলেটে গার্মেন্টস বা অন্য কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই যে কাজ করবে,হাওরের জমিতে ফসলও হয় বছরে ১ বার তাও বন্যার কারনে প্রতিবছর ঘরে তুলা যায় না।গত ৭/৮ বছর ধরে এই মানুষগুলো অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে কেউ খবর রাখে নি। ওদের ভীতরের জমে থাকা ক্ষোভের বিষ্ফোরন এই লুটপাট।
আপনি ভিডিও দেখে থাকলে দেখবেন যে নৌকায় করে পাথর লুট করেছে তাতে মহিলারাও পুরুষদের সাথে অংশ নিয়েছে।কেন? কারন তাদের থেকে তাদের কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে তাদেরকে কর্মশূন্য করা হয়েছিল। যা থেকে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ও লুটপাট।
এইগুলো স্থানীয় মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না,সবাইতো ঘুরতে যায়,আনন্দ ফুর্তি করে,ছবি তুলে,কিন্তু স্থানীয় মানুষের এসব দু:খ আজ পর্যন্ত কোনো পত্রিকায় ছাপা হয়নি।
সবাই শুধু সাদাপাথরের সৌন্দর্য নিয়েই লেখে এর পিছনের হাহাকার নিয়ে কেউ লিখেনি।
দেশের চাহিদা মিটিয়ে যে পাথর আমরা ভারতের কাছে বিক্রি করতাম সেই পাথরই পরিবেশ রক্ষার আড়ালে তারা আমাদের কাছে বিক্রি করছে। আমরা ফ্রী পাওয়া পাথর না উত্তোলন করে বিপুল পরিমান ডলারের বিনিময়ে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছি।
বিনিময়ে আমাদের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, শত শত ক্রাশার মিল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আর এর ফাঁকে কপালে ডেকে এনেছি বন্যা নামক ভয়ংকর অভিশাপ।
২০২২ এবং ২৪ সালে সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার আগমন ঘটে। ২২ সালের জুনে বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল ১৪৫২ মিমি আর ২৪ এর জুনে ২১৫৫ মিমি। মেঘালয় চেরিপুঞ্জির বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে ধলাই নদী ও পিয়াইন নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
পাথর উত্তোলন বন্ধের ফলে এই নদীগুলোর নাব্যতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবেশ রক্ষার প্রতিদানে আমরা ডেকে নিয়ে আসি ভয়াল বন্যার করাল গ্রাসকে।
এই অঞ্চলের পাথর ছিল আমাদের জন্যে আশীর্বাদ, প্রকৃতির অনন্য অর্থনৈতিক উপহার। রাষ্ট্র এই পাথর শিল্পকে চালু রাখলেই আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হত, নির্মাণ শিল্পের আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে আমরা রপ্তানিতে এগিয়ে যেতাম। সাশ্রয় হতো বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।শুধুমাত্র ভারত থেকে আমদানি বাড়িয়ে তাদেরকে খুশি করতেই তখন এই শিল্পটাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।
আপনার পাথরের আবেগকে পুঁজি করেই ভারত আমাদের পকেট কেটে নিয়েছে। আপনি সাদা পাথরের ঝলকানিতে অন্ধ হয়ে বানের পানিতে হাবুডুবু খেয়েছেন।
ছবিগুলো ২০১১ সালে আমার নিজহাতে উঠানো।