06/01/2026
শূন্য থেকে বড় স্বপ্নকে সত্যিতে রূপান্তর করার গল্প
আমি পারলে আপনিও পারবেন।
উচ্চশিক্ষা মোটেও খুব কঠিন কিছু নয়—শুধু দরকার ইচ্ছাশক্তি আর নিরলস চেষ্টা।
আমি জ়ামান।
আজ আমি বলব আমার জার্মানিতে পড়াশোনার যাত্রার গল্প—কীভাবে আমি শূন্য থেকে শুরু করে জার্মানির মতো একটি দেশে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসতে পেরেছি, শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছাশক্তি আর আল্লাহর সাহায্যে। আশা করি, আমার এই যাত্রা থেকে অনেকেই উপকৃত হবেন এবং নিজের উপর হারিয়ে ফেলা বিশ্বাস আবার ফিরে পাবেন।
স্কুল জীবন: ব্যাকবেঞ্চার পরিচয়
স্কুল জীবন থেকেই আমি সবসময় একজন ব্যাকবেঞ্চার ছাত্র ছিলাম। পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ ছিল না। এক কথায়, কোনো রকমে পড়ে পাশ করতাম। কারণ পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াতেই আমার বেশি আগ্রহ ছিল। ভাগ্য ভালো যে, এখানেও আমি টিকে গেছি—কারণ আমার জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল অনেক বন্ধু।
এই কারণে বাবার কাছ থেকে অনেক বকা ও মার খেতে হয়েছে, কিন্তু তবুও আমি আমার মতোই ছিলাম।
এভাবেই চলতে চলতে স্কুলের এসএসসির আগে টেস্ট পরীক্ষা এলো। পরীক্ষা ভালোই দিয়েছিলাম, কিন্তু টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলাম। ফলে আমাকে বলা হলো—আমি এসএসসি বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব না, কারণ আমি মূল পরীক্ষায়ও ফেল করব এবং এতে স্কুলের সুনাম নষ্ট হবে।
অনেক কিছুর পর কোনোভাবে আবার সব ঠিক হলো। যদিও একজন স্কুল শিক্ষকের বিশেষ সহযোগিতায় আমি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। এরপর পড়াশোনা শুরু করলাম মন দিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ, এসএসসিতে GPA 4.44 পেলাম।
কিন্তু এরপর আবার আগের রাস্তায় ফিরে গেলাম। এবার আরও বেশি বন্ধু বানালাম। আশপাশের সব এলাকাতেই বন্ধুবান্ধব হয়ে গেল—আমি আর নিজের এলাকায় সীমাবদ্ধ রইলাম না। তাহলে বুঝতেই পারছেন, আমি কী লেভেলের আড্ডাবাজ ছিলাম।
আমার বাবা জানতেন—এই পথে চললে আমার কিছুই হবে না। কারণ আমার পড়াশোনার কোনো আগ্রহই ছিল না। আমার ইচ্ছা ছিল রাজনীতি করব আর এলাকায় ব্যবসা করব।রাজনীতিতে নিজের নাম লেখালাম। দিন ভালোই চলছিল। যদিও আমার বাবা জানতেন না যে আমি রাজনীতি করি, কারণ বাবাকে আমি খুব ভয় পেতাম।
এভাবেই বাসায় বিচার বসত, আর বাবা আমাকে মারতেন।
কলেজ জীবন
এরপর কলেজে ভর্তি হওয়ার পালা। পাবলিক কলেজে চান্স না পাওয়ায় একটি প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হলাম। কোনোভাবে পড়াশোনা চালাচ্ছিলাম। এখানেও ব্যাকবেঞ্চার হয়ে গেলাম। বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ ফাঁকি দিতাম, আড্ডা দিতাম, কয়েকবার মারামারিও করেছি।
এভাবেই প্রথম বর্ষ শেষ করলাম। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে পড়াশোনা নামমাত্র চলছিল। আমিও আমার মতোই উদাসীন।
এরপর আবার এইচএসসি প্রি-টেস্ট পরীক্ষা এলো। এবারও তিনটি বিষয়ে ফেল করলাম। ভাগ্যটাই খারাপ। ফেল করে বাসায় ফিরলাম, বাবা মার দিলেন।
এভাবেই দিন যাচ্ছিল—সাল তখন ২০১৬।
কিন্তু কে জানত, এই বছরেই আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটবে। কিছুদিন পরই আমার বাবা স্ট্রোক করে ইন্তেকাল করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার জীবনের আসল অধ্যায়।
বাবাকে হারিয়ে আমি বুঝলাম—জীবন কতটা কঠিন। বাবার মৃত্যু আমার জীবনে ভয়াবহভাবে আঘাত করে। জীবনের কষ্ট আমি হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছি। হয়তো এটাই ছিল আজ আমাকে এই জায়গায় পৌঁছানোর কারণ।
বাবার শোক কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম—নিজের জীবন সম্পূর্ণ বদলে ফেলব।
প্রথমেই বন্ধুবান্ধব ছাড়লাম, রাজনীতি ছাড়লাম, শুরু করলাম সত্যিকারের পড়াশোনা।
আলহামদুলিল্লাহ, এইচএসসি পরীক্ষায় GPA 4.83 পেলাম।
# # # বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশ ভাবনা
এরপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই জায়গায় পরীক্ষা দিলেও অপেক্ষমাণ তালিকায় পড়ে বাদ পড়লাম। তারপর একটি জাতীয় কলেজে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলাম। এখানে পড়াশোনার চাপ তুলনামূলক কম ছিল, কারণ আমাকে কাজও করতে হতো—দিন শেষে টাকার দরকার ছিল।
এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ পার হলো, দ্বিতীয় বর্ষও শুরু হলো। কিন্তু একসময় মনে হলো—এই কলেজে পড়ে জীবনে তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ জাতীয় কলেজে নামেই পড়াশোনা, বাস্তবে তেমন কিছু হয় না।
এ সময় মাথায় আসে বিদেশে পড়াশোনার চিন্তা। নিজের ক্যারিয়ার সেটেল করতে হবে, আর বাংলাদেশের এই আয়ে আমার হবে না। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল, কিন্তু টাকার অভাবে সাহস পাচ্ছিলাম না। কোন দেশে যাব—এই চিন্তায় ছিলাম।
২০২০ সালে একদিন ছোটবেলার এক বন্ধু বলল,
“চল, জার্মানি যাই।”
আমি বললাম,
“আমার তো টাকা নেই, কীভাবে যাব?”
সে বলল,
“জার্মানিতে যেতে টাকা লাগে না, শুধু যোগ্যতা লাগে।”
আমি বললাম,
“ফ্রি মানে? যদি সত্যিই ফ্রি হয়, তাহলে আমি পারব।”
এরপর বাসায় এসে জার্মানি নিয়ে রিসার্চ শুরু করলাম। দেখলাম—জার্মানির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে কোনো টিউশন ফি লাগে না। কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিল না। জার্মানির মতো দেশে কীভাবে ফ্রি পড়াশোনা সম্ভব?
একদিন সকালে জার্মান এম্বাসির সামনে গেলাম। ভাবলাম, কাউকে সরাসরি জিজ্ঞেস করব। ভাগ্য ভালো—একজনকে পেলাম, যিনি ভিসা ইন্টারভিউয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। সব ভয়-লজ্জা ভুলে জিজ্ঞেস করলাম,
“ভাই, জার্মানিতে কি ফ্রি পড়াশোনা করা যায়?”
তিনি বললেন,
“হ্যাঁ, টিউশন ফি নেই। শুধু ব্লক অ্যাকাউন্ট লাগে।”
এই উত্তরটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।
# # # সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি
এরপর বন্ধুকে নিয়ে আমার একমাত্র বড় বোনের কাছে গেলাম। সব খুলে বললাম। প্রথমে তিনিও বিশ্বাস করেননি। পরে বুঝালাম—ফ্রি, শুধু ব্লক অ্যাকাউন্ট লাগে, যেটা পরে ফেরত পাওয়া যায়। তখন ব্লক অ্যাকাউন্টের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭,৫০০ ইউরো।
সব বোঝানোর পর আমার বন্ধু বোনকে বলল—এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কিছু হবে না, বরং একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিন। ২৫% ক্রেডিট শেষ করে ব্যাচেলর নিয়ে চলে যাবে। কারণ সে আমার থেকে একটু বড় ছিল এবং মাস্টার্সে যাবে।
এরপর ভালোভাবে রিসার্চ করে দেখলাম—জার্মানিতে কোন সাবজেক্টের চাহিদা বেশি। সব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, আইটি পড়ব। এরপর UITS-এ ভর্তি হলাম। পুরো দমে পড়াশোনা শুরু করলাম, কারণ আমাকে দেশ ছাড়তেই হবে।
এভাবেই প্রথম সেমিস্টার শেষ হলো। এর মাঝেই শুরু হলো কোভিড-১৯—ভয়াবহ আতঙ্ক। মনে প্রশ্ন আসছিল, জার্মানিতে গিয়ে যদি চাকরি না পাই, তাহলে কীভাবে টিকে থাকব? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—জীবনই যদি না থাকে, তাহলে জার্মানি আর পড়াশোনা দিয়ে কী হবে?
এই চিন্তায় কিছুটা থেমে গেলাম। কিছুদিন পর দেখলাম, সেই বন্ধু হঠাৎ করেই জার্মানি চলে গেছে এবং ভালোই আছে। আর আমি পিছিয়ে পড়লাম।
এর মধ্যেই চতুর্থ সেমিস্টার চলে এলো। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি অবশ্যই মাস্টার্স করব, আর সেটা জার্মানিতেই করব।
# # # IELTS ও আবেদন প্রক্রিয়া
এভাবেই পড়াশোনা চলছিল। নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, স্কিল ডেভেলপ করছিলাম—শুধু ভাষা বাদে। তখন আমার জীবনে ছিল পড়াশোনা আর দুইজন ছাত্রকে টিউশন করানো।
সব হিসাব-নিকাশ করতে করতে ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল এম্বাসিতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। এখান থেকেই শুরু হলো আসল খেলা। ব্যাচেলর শেষের দিকে, IELTS প্রস্তুতি শুরু করলাম। জার্মান স্টাডির সব রিসোর্স সংগ্রহ করে প্রসেসগুলো নোট করে রাখছিলাম।
IELTS প্রস্তুতির গল্পটা ছিল একদম আলাদা। এম্বাসির রিকোয়ারমেন্ট ছিল ৫.৫। মনে হলো, এটা আমার জন্য সহজ হবে। তাই খুব বেশি চাপ দিইনি। কোনো বই কিনিনি, কোচিংও করিনি। শুধু পিডিএফ পড়েছি। ৩–৪টি ইউটিউব চ্যানেল ফলো করেছি। বাংলায় ফ্রি মক টেস্ট দিয়েছি।
ভোর ৪টায় উঠে লিসেনিং প্র্যাকটিস করতাম। দুপুরে রিডিং, বিকেলে রাইটিং, রাতে স্পিকিং—এভাবেই চলত। মে ২০২৪-এ IELTS পরীক্ষা দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, স্কোর এল ৬.০।
টেনশন ছিল না। কারণ আমার প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ছিল। তবে বলব—আপনারা ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবেন। কারণ ৬.০ স্কোরের কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারিনি।
IELTS রেজাল্ট আসার আগেই MOI দিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলাম। দুইটি থেকে অফার পেলাম। এরপর IELTS দিয়ে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলাম—BTU Cottbus—সেখান থেকেও অফার পেলাম।
সব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম—Frankfurt University of Applied Sciences-ই আমার জন্য সবচেয়ে ভালো। বড় শহর, ভালো সাবজেক্ট, ভালো কমিউনিটি। আল্লাহর নাম নিয়ে ভর্তি নিলাম।
# # # দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভিসা
হিসাব করছিলাম—১৯ মাস কবে শেষ হবে। কিন্তু ২১ মাস পার হয়ে গেল, তবুও জার্মানি যেতে পারিনি। ব্যাচেলর শেষ করার পর চাকরি পেয়েও করিনি—ভেবেছিলাম কয়েকদিন পরই চলে যাব। কে জানত, যেতে ৩০ মাস লাগবে?
এরপর শুরু হলো চারপাশের প্রশ্ন—কবে যাব? টাকা দিচ্ছি, কিন্তু যাওয়ার খবর নেই। বয়স বাড়ছে, চাকরি করছি না। সব দিক থেকে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করুন।
এরপর একটি আইটি কোম্পানিতে চাকরি নিলাম। এক বছর কাজ করার পর একসময় মনে হলো—জার্মানির স্বপ্ন বুঝি শেষ।
এই হতাশার মধ্যেই এক রাতে ইতালির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি আবেদন করলাম। কয়েকদিন পর University of Parma থেকে অফার পেলাম। আলহামদুলিল্লাহ। ইতালির জন্য ডকুমেন্টস প্রস্তুত করা শুরু করলাম। ইতালির ডকুমেন্ট কত যে বেশি—তা না গেলে বোঝা যায় না।
তবুও প্রস্তুত করলাম। কারণ আমার যেতেই হবে। ইতালি বেছে নেওয়ার একটাই কারণ—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো টিউশন ফি নেই, বরং রিজিওনাল স্কলারশিপ দেয়।
সেপ্টেম্বরে VFS স্লটও নিলাম। ঠিক তখনই জার্মান এম্বাসির কাজ দ্রুত এগোতে শুরু করল। দ্বিতীয় ডকুমেন্ট পাওয়ার পর বুঝলাম—দুই মাসের মধ্যে হয়তো ভিসার মেইল পেয়ে যাব। তখন ইতালির সব প্রসেস বন্ধ করে দিলাম। প্রায় এক লাখ টাকা লস হলেও সেটা কিছুই না—কারণ জার্মানির প্রতি আমার আবেগ, ভালোবাসা আর পাঁচ বছরের অপেক্ষা।
# # # চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
ব্লক অ্যাকাউন্টের টাকার জন্য শেষ পর্যন্ত নিজের একটি জমি বিক্রি করলাম। মনে মনে ভাবলাম—ক্যারিয়ার না হলে জমি দিয়ে কী হবে? ক্যারিয়ার হলে তিনটা জমি কিনব।
একদিন ডকুমেন্টস মেইল পেলাম। চাকরি ছেড়ে দিলাম। সব কাগজ আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। একশবার চেক করেছিলাম—কারণ একটি ভুল মানে পাঁচ বছরের কষ্ট শেষ।
আমি এতটাই কনফিডেন্ট ছিলাম যে, দুই মাস আগেই ডরম বুক করে রেখেছিলাম। বাংলাদেশ থেকেই ৪০০ ইউরো ভাড়া দিয়েছি। ভিসার এক মাস আগে ফ্লাইট টিকিট কেটেছি।
৫ নভেম্বর ২০২৫ VFS স্লট,
১১ নভেম্বর ভিসা হাতে,
১৯ নভেম্বর ফ্লাইট,
আর ৮ দিনের মাথায় জার্মানি।
জার্মানিতে নতুন জীবন
২০ নভেম্বর ২০২৫ ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলাম। বন্ধু রবিন ও শুভ কর্মকার আমাকে রিসিভ করতে এলো। ডরম থাকার কারণে সরাসরি বাসায় উঠতে পারলাম। সব ডকুমেন্ট ঠিক থাকায় প্রসেস সহজ হয়েছে।
বন্ধুরা দুই দিনের মধ্যেই সিম, ব্যাংক, বাজার, রুম, সিটি রেজিস্ট্রেশন—সব করে দিল। এরপর ভাবলাম—এখন থেকে নিজের লড়াই নিজেকেই করতে হবে।
ছয় দিনের মধ্যেই ব্যাংক, ট্যাক্স আইডি, সোশ্যাল আইডি, হেলথ ইন্স্যুরেন্স সব সম্পন্ন করলাম। এমনকি একটি ২০০০ ইউরোর চার্জও ওয়েভার করাতে পেরেছি।
# # # চাকরির সংগ্রাম
সব ডকুমেন্ট প্রস্তুত, এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—চাকরি।
দুই বন্ধু মিলে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের সব রেস্টুরেন্টে ঘুরে চাকরির জন্য সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি। জানি, নতুন আসা অনেক ছাত্র এই কাজটা করতে পারে না। কিন্তু আমরা লজ্জা-ভয় ভুলে চেষ্টা করেছি।
সবাই রিজেক্ট করল। বলল, এখন লোক লাগবে না, মার্চ ২০২৬-এ লাগতে পারে।
৪–৫ দিন পর আল্লাহর রহমতে একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম। সেখানে ম্যানেজার আমাকে নিল, কিন্তু বন্ধুকে নিল না—কারণ একজন লোকই দরকার ছিল। ট্রায়ালের তারিখ দিল।
ট্রায়াল দিয়ে এসে বুঝলাম—হয়তো নেবে না। তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। পরদিন ম্যানেজার ফোন দিল—সব ডকুমেন্ট নিয়ে যেতে বলল।
আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া—জার্মানিতে আসার ১০ দিনের মাথায় চাকরি পেয়ে গেলাম। এক বছরের কন্ট্রাক্ট। এখন পড়াশোনার চিন্তা করা যায়।
এক মাস কাজ করে ১.৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ বেতন পেলাম। যদিও সব খরচ বাদে হাতে থাকল মাত্র ১০ হাজার। কারণ এখানে নিজের খরচ অনেক। কিন্তু শান্তি এখানেই—আমি একটি পথ খুঁজে পেয়েছি।
আমার লক্ষ্য এই টাকা নয়। আমার লক্ষ্য পড়াশোনা শেষ করে ফুলটাইম জব করা এবং এর চেয়ে ৩–৪ গুণ বেশি আয় করা।
শেষ কথা
আমি জানি, আমার গল্প অনেক বড় হয়ে গেছে। কিন্তু এই গল্পে হয়তো অনেক ব্যাকবেঞ্চারের জন্য অনুপ্রেরণা আছে।
বিশ্বাস করুন—আমি পারলে আপনিও পারবেন।
আমি ভালো ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু আমার ইচ্ছাশক্তি ছিল ক্লাসের টপ ছাত্রদের থেকেও বেশি। আমি বিশ্বাস করতাম—ওরা পারলে আমি কেন পারব না?
এই বিশ্বাসই আজ আমাকে স্বপ্নের প্রথম ধাপে পৌঁছে দিয়েছে।
জার্মানি আসা সত্যিই সহজ, কিন্তু জীবন কঠিন।
চাকরি, পড়াশোনা, রান্না, বাজার, পরিবার—সব মিলিয়ে জীবন কঠিন, কিন্তু দিনের শেষে এক অদ্ভুত শান্তি থাকে।
সবসময় কৃতজ্ঞ থাকবেন।
যে সাহায্য করবে, তাকে অস্বীকার করবেন না।
নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, একদিকে ফোকাস রাখুন।
সাফল্য নিজেই আসবে।
অহংকারী হবেন না।
কারণ সূর্য ডোবার আগেই মানুষের ছায়া বড় হয়।
শুধু টাকার পেছনে দৌড়াবেন না।
পড়াশোনা শেষ করলে আরও ৩–৪ গুণ বেশি আয় করতে পারবেন।
সবাইকে শুভকামনা।
আমার জন্য দোয়া করবেন।
ইনশাআল্লাহ, জার্মানিতে দেখা হবে। 🇩🇪