23/09/2026
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এ যুগের মানুষ হিসাবে আপনাদের কিছু হেলথি অভ্যাস থাকা উচিত। অভ্যাস গঠন করাও খুব কঠিন কিছু না। ২১ দিন নিয়মিত একটা কাজ করেন। দেখবেন সেই কাজটাই আপনার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
সুবিধা অনুযায়ী নিচের এই জিনিসগুলো নিজের লাইফে ইমপ্লিমেন্ট করা শুরু করেন।
১/ হাঁটার অভ্যাস করেন। এ যুগের মানুষ সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে হাঁটার অভ্যাস। অফিসে বসে কাজ, বাসায় এসে সোফায় বসা, তারপর বিছানায় শুয়ে ফোন। পুরো দিন চলে যায়, কিন্তু শরীর ঠিকমতো নড়েই না। অথচ আল্লাহ আমাদের শরীরটাই বানিয়েছেন চলার জন্য। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট হাঁটেন। রক্ত চলাচল ভালো থাকবে। স্ট্রেস কমবে। ব্রেনে নতুন চিন্তা আসবে। অনেক সময় যে সিদ্ধান্তটা টেবিলে বসে নিতে পারেন না, সেটা একা হাঁটতে হাঁটতেই মাথায় চলে আসে। হাঁটাকে কষ্ট ভাববেন না। হাঁটাকে নিজের জীবনের অংশ বানান।
২/ ঘুমকে সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দিবেন। এই যুগে মানুষ সবচেয়ে বেশি অন্যায় করে নিজের ঘুমের সাথে। রাত দুইটা পর্যন্ত ফোন চালাবে। সিরিজ দেখবে। বন্ধুদের সাথে চ্যাট করবে। তারপর সকালে উঠে বলবে, শরীর ভালো লাগে না, কোনো কাজেই মন বসে না। ব্রাদার এন্ড সিস্টার্স, শরীর কি আপনার শত্রু? আপনি যদি প্রতিদিন তাকে বিশ্রাম না দেন, একদিন সে নিজেই বিশ্রাম নিতে বাধ্য করবে। ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা ওষুধের নাম ঘুম। কিন্তু মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে এই ওষুধটাই।
৩/ ফোন ব্যবহার করেন উদ্দেশ্য নিয়ে। ফোন এখন মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে অভ্যাস বেশি হয়ে গেছে। অনেকেই ফোন হাতে নেওয়ার পাঁচ মিনিট পরে ভুলে যায় কেন ফোনটা হাতে নিয়েছিল। তারপর এক রিলস, দুই রিলস, তিন রিলস করতে করতে এক ঘণ্টা শেষ। মনে রাখবেন, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো আপনার সময় বিক্রি করে টাকা আয় করে। আপনি যত বেশি স্ক্রল করবেন, তারা তত বেশি লাভ করবে। তাই ফোন খুলার আগে নিজের কাছে একটা প্রশ্ন করেন। আমি এখন কেন ফোনটা খুলছি? কারণ পরিষ্কার না থাকলে ফোন আপনার সময়ও নিবে, মনোযোগও নিবে।
৪/ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। অনেকেই মনে করেন নামাজ শুধু আখিরাতের জন্য। আমি বলবো, দুনিয়ার জন্যও। দিনে পাঁচবার সব কাজ থামিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি আছে। মন খারাপ, ব্যবসায় লস, সংসারে সমস্যা, চাকরির চাপ, সবকিছুর মাঝেও নামাজ মানুষকে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। অজুহাত কমান। শুরু করেন। প্রথমে কষ্ট হবে। তারপর দেখবেন, যে কাজটা কঠিন লাগতো, সেটাই একদিন সবচেয়ে সহজ অভ্যাস হয়ে গেছে।
৫/ সেভিংস করার অভ্যাস করেন। স্টুডেন্ট জীবন থেকেই করেন। অল্প হলেও করেন। অনেক মানুষ ভালো টাকা আয় করে, কিন্তু মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না। কারণ, আয় বাড়ার সাথে সাথে খরচও বাড়িয়ে ফেলে। মনে রাখবেন, টাকা আপনার স্বাধীনতা। টাকা থাকলে অনেক সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছায় নিতে পারবেন। টাকা না থাকলে অনেক সিদ্ধান্ত অন্যের ইচ্ছায় নিতে হয়। তাই শুধু আয় বাড়ানোর চিন্তা কইরেন না। টাকা ধরে রাখার অভ্যাসও গড়ে তোলেন। তারপর শেখেন, বুঝেন, ইনভেস্ট করেন।
৬/ ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন দূরে রাখেন। ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল চালানো এখন মানুষের সবচেয়ে খারাপ অভ্যাসগুলোর একটা। অনেকেই বলে, আর পাঁচ মিনিট দেখি। সেই পাঁচ মিনিট কখন এক ঘণ্টা হয়ে যায়, নিজেরাও বুঝে না। তারপর মাথা ভার লাগে, সকালে উঠতে কষ্ট হয়। ঘুমানোর আগে বই পড়েন। পরিবারের মানুষের সাথে দুইটা কথা বলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু আকাশ দেখেন। দিনের শেষটা স্ক্রিন দিয়ে না, নিজের মনকে শান্ত করে শেষ করেন।
৭/ খাওয়ার পরে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটেন। অনেকেই ভাত খেয়েই বিছানায় শুয়ে যায়। আবার কেউ ফোন নিয়ে বসে যায়। এই অভ্যাসটাই ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে। খাওয়ার পরে একটু হাঁটেন। খুব বেশি না। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট। দেখবেন হজম ভালো হচ্ছে। গ্যাসের সমস্যা কমে যাচ্ছে। শরীরও ভারী লাগছে না। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় বড় রোগ থেকে মানুষকে দূরে রাখে।
৮/ সবজি বেশি খান। এই যুগে মানুষ খাবারের স্বাদ দেখে বেশি, গুণ দেখে কম। জিহ্বা যা চায়, সেটাই খেতে চায়। কিন্তু শরীরের চাহিদা আর জিহ্বার চাহিদা এক না। ভাত একটু কম খান। সবজি বেশি খান। চিনি কমানোর চেষ্টা করেন। কোমল পানীয় বাদ দেন। মনে রাখবেন, আজ যা খাচ্ছেন, পাঁচ বছর পরে আপনার শরীর সেটারই রিপোর্ট কার্ড দেখাবে।
৯/ প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নতুন কিছু শেখেন। যার শেখা বন্ধ, তার উন্নতিও বন্ধ। চাকরি করেন, ব্যবসা করেন, স্টুডেন্ট হন, কোনো সমস্যা নাই। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নিজের জন্য রাখেন। একটা বই পড়েন। নতুন একটা স্কিল শেখেন। একটা ভাষা শেখেন। পৃথিবী খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। আপনি যদি না বদলান, পৃথিবী আপনাকে পিছনে ফেলে দিবে। জিন্দা লাশ হওয়া যাবে না।
১০/ সকালটা যতটা সম্ভব শান্ত রাখেন। ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিবেন না। কে কী পোস্ট দিল, কে কী বললো, কোন নিউজ আসলো, এগুলো দিয়ে দিন শুরু করবেন না। সকালটা নিজের জন্য রাখেন। একটু হাঁটেন। কোরআন পড়েন। নামাজ পড়েন। দিনের পরিকল্পনা করেন। সকাল যেমন শুরু হয়, অনেক সময় পুরো দিনটাও তেমন কাটে।
১১/ পর্যাপ্ত পানি পান করেন। শরীর অনেক সময় পানি চায়, আমরা বুঝি ক্ষুধা লাগছে। তারপর অপ্রয়োজনীয় খাবার খেয়ে ফেলি। অনেকেই সারাদিনে দুই গ্লাস পানিও খায় না। অথচ পানি শরীরের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটা। সফট ড্রিংকস, চা কিংবা কফি পানির জায়গা নিবে না। পানি পানির জায়গাতেই রাখেন।
১২/ ভালো মানুষের সাথে সময় কাটান। সব অসুস্থতা শরীরে হয় না। কিছু অসুস্থতা মানুষের সঙ্গ থেকেও আসে। সারাদিন যদি নেগেটিভ মানুষদের সাথে থাকেন, একসময় আপনিও নেগেটিভ হয়ে যাবেন। আবার যাদের স্বপ্ন আছে, ডিসিপ্লিন আছে, শেখার আগ্রহ আছে, তাদের সাথে থাকলে আপনিও বদলাতে শুরু করবেন। মানুষ তার আশেপাশের পাঁচজন মানুষের গড় হয়ে যায়।
১৩/ রাগ জমিয়ে রাখেন না। রাগ, অভিমান আর কষ্ট বুকে জমিয়ে রাখলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি আপনারই হয়। অনেক মানুষ বাইরে হাসে, ভিতরে পুড়ে। এই আগুন একদিন শরীরেও প্রভাব ফেলে। ক্ষমা করতে শেখেন। সব মানুষের জন্য না। নিজের শান্তির জন্য। মনে রাখবেন, শান্তিতে ঘুমাতে পারাও একটা বড় নেয়ামত।
১৪/ প্রতি চার মাসে অন্তত একবার কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেন। খুব দূরে যেতে হবে না। জেলার বাইরে, গ্রামের বাড়ি, নদীর পাড়, পাহাড় কিংবা সমুদ্র, যেখানেই হোক। একই ঘর, একই অফিস, একই রাস্তা আর একই রুটিনের মধ্যে জীবন আটকে রাইখেন না। হাওয়া বদল খুবই জরুরি। অনেক সময় জায়গা বদলালেই মন বদলে যায়। নতুন জায়গা মানুষকে নতুন শক্তি দেয়।
১৫/ প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট নিজের সাথে সময় কাটান। কোনো ফোন না। কোনো মানুষ না। শুধু আপনি। নিজের জীবনটা নিয়ে ভাবেন। কোথায় আছেন, কোথায় যেতে চান, কী ভুল করছেন, কী ঠিক করছেন। আমরা সবার খবর রাখি, কিন্তু নিজের খবর রাখি না। যে মানুষ নিজের সাথে বসে না, একদিন সে নিজের জীবনটাই অন্যের ইচ্ছামতো কাটিয়ে দেয়।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কথা এখন বলবো। স্বাস্থ্য আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। এই নেয়ামতের মূল্য মানুষ তখনই বুঝে, যখন সেটা হারিয়ে ফেলে।
তাই হাসপাতালে যাওয়ার আগে শরীরের যত্ন নেন। ওষুধ খাওয়ার আগে অভ্যাস বদলান। মনে রাখবেন, ভালো অভ্যাসের কষ্ট কয়েক দিনের। কিন্তু খারাপ অভ্যাসের শাস্তি অনেক সময় সারাজীবনের।