15/06/2026
ইন্টারনেট চালানো সার্ভারের অতিরিক্ত তাপ একসময় অপচয় হতো। এখন সেই তাপই ফিনল্যান্ডে আবাসন, অফিস আর সরকারি ভবন গরম রাখতে ব্যবহার হচ্ছে। Google, Microsoft-সহ একাধিক প্রযুক্তি সংস্থা ডেটা সেন্টারের বর্জ্য তাপ সরাসরি শহরের হিটিং নেটওয়ার্কে পাঠাচ্ছে। দীর্ঘ শীত আর বাড়তে থাকা এআই অবকাঠামোর মধ্যে এই প্রযুক্তি এখন ইউরোপের জ্বালানি ব্যবস্থার নতুন মডেল হয়ে উঠছে।
---
ফিনল্যান্ডে এখন এমন ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে, যেগুলো শুধু ইন্টারনেট চালায় না, একই সঙ্গে শহরের হাজার হাজার মানুষের ঘরও গরম রাখে। সার্ভার থেকে বের হওয়া অতিরিক্ত তাপকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি আবাসন, অফিস আর সরকারি ভবনে তাপ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপে দ্রুত বাড়তে থাকা এআই আর ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাপে যেখানে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, সেখানে ফিনল্যান্ড সেই একই অবকাঠামোকে শহরের জ্বালানি ব্যবস্থার অংশে বদলে ফেলছে।
ডেটা সেন্টারের ভিতরে হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে। এই সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বিশাল কুলিং সিস্টেম চালাতে হয়। সেই প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত তাপ উৎপন্ন হয়। সাধারণভাবে এই তাপ বাইরে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু ফিনল্যান্ডের একাধিক প্রকল্পে সেই তাপ সংগ্রহ করে বড় শিল্প-মানের হিট পাম্পের সাহায্যে ৬০ থেকে ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। তারপর গরম জল ডিস্ট্রিক্ট হিটিং নেটওয়ার্কের পাইপ দিয়ে শহরের বিভিন্ন ভবনে পৌঁছে যাচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের Hamina শহরে Google-এর ডেটা সেন্টার এখন এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। ২০২৪ সালে সংস্থাটি জানায়, তাদের হিট রিকভারি প্রকল্প পূর্ণমাত্রায় চালু হলে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ হিটিং চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। স্থানীয় আবাসন, স্কুল আর সরকারি ভবন এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। Google-এর হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প বছরে কয়েক হাজার টন কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করতে পারে।
শুধু Google নয়, Microsoft-ও ফিনল্যান্ডে একই ধরনের বড় পরিকল্পনা শুরু করেছে। Fortum-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হওয়া নতুন ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক থেকে উদ্ধার হওয়া তাপ Espoo, Kauniainen আর Kirkkonummi অঞ্চলের ডিস্ট্রিক্ট হিটিং ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হবে। Fortum জানিয়েছে, প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ওই এলাকার প্রায় ৪০ শতাংশ গরমের চাহিদা ডেটা সেন্টারের বর্জ্য তাপ থেকেই আসতে পারে। এই প্রকল্পকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার হিট-রিকভারি উদ্যোগগুলোর মধ্যে ধরা হচ্ছে।
হেলসিঙ্কিতেও একই প্রযুক্তি বহু বছর ধরে ব্যবহার হচ্ছে। শহরের জ্বালানি সংস্থা Helen ইতিমধ্যেই ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার করে হাজার হাজার ফ্ল্যাট গরম রাখছে। সেখানে সার্ভার কক্ষের তাপ প্রথমে কুলিং সিস্টেম থেকে সংগ্রহ করা হয়, তারপর বিশাল হিট পাম্প সেটিকে আরও উচ্চ তাপমাত্রায় রূপান্তর করে ডিস্ট্রিক্ট হিটিং লাইনে পাঠায়। এই পুরো ব্যবস্থার ফলে একই শক্তি থেকে একসঙ্গে কম্পিউটিং আর তাপ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের ঠান্ডা আবহাওয়া এই প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। দেশের দীর্ঘ শীতের কারণে হিটিংয়ের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে বাইরের কম তাপমাত্রা ডেটা সেন্টারের কুলিং খরচও কমায়। ফলে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে কম শক্তি লাগে, আবার সেই সার্ভারের উৎপন্ন তাপ শহরের কাজে ব্যবহার করা যায়। ইউরোপের অনেক দেশে নতুন হিটিং অবকাঠামো তৈরি করতে হলেও ফিনল্যান্ডে আগে থেকেই বিস্তৃত ডিস্ট্রিক্ট হিটিং নেটওয়ার্ক ছিল। তাই নতুন পাইপলাইন তৈরির বদলে শুধু নতুন তাপ উৎস যুক্ত করলেই কাজ হচ্ছে।
২০২৬ সালে এই প্রযুক্তি আরও বড় আকার নিতে শুরু করেছে। atNorth নামের একটি ডেটা সেন্টার সংস্থা Espoo অঞ্চলে তাদের উদ্ধার করা তাপ সরাসরি Kesko-র খুচরা বিপণি ভবনে ব্যবহার শুরু করেছে। একই সময়ে Saarijärvi অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা হয়েছে, যেটি শুরু থেকেই স্থানীয় হিটিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ডেটা সেন্টার যদি তাপের চাহিদাসম্পন্ন শহুরে এলাকার কাছে তৈরি হয় এবং উন্নত হিট পাম্প ব্যবহার করা যায়, তাহলে সার্ভারের বর্জ্য তাপ ডিস্ট্রিক্ট হিটিংয়ের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। গবেষকরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির কারণে ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা আরও বাড়বে। ফলে এই অতিরিক্ত তাপকে পুনর্ব্যবহার করা না গেলে বিপুল পরিমাণ শক্তি অপচয় হবে।
একসময় ডেটা সেন্টারকে শুধু বিশাল বিদ্যুৎ-খেকো ভবন হিসেবে দেখা হতো। এখন ফিনল্যান্ডে একই ভবনকে একসঙ্গে কম্পিউটিং কেন্দ্র, তাপ উৎপাদন কেন্দ্র আর শহুরে জ্বালানি অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সার্ভারের ভিতরে চলতে থাকা এআই মডেল আর ক্লাউড পরিষেবার তাপই এখন পাশের আবাসনের রেডিয়েটর গরম রাখছে।
📍 যুক্ত হোন : বিজ্ঞানচর্চা - BigganChorcha