30/06/2025
ভয়নিক পাণ্ডুলিপি — এক অদ্ভুত নিঃশব্দ চিৎকার:
সময়টা ছিল ১৯১২ সাল। এক অচেনা অন্ধকারে ঢাকা ভিয়েনা শহরের প্রান্তে, এক পুরনো যাজক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। বহু বছরের জমে থাকা ধুলো ও ছত্রাকের গন্ধে ঠাসা সেই ভাঙা বইয়ের স্তূপে হঠাৎই চোখে পড়লো এক অভূতপূর্ব চামড়া বাঁধা পাণ্ডুলিপি। বইটি ছিল চওড়া, পাতাগুলো পার্চমেন্টে লেখা, আর তাতে আঁকা ছিল অদ্ভুত সব উদ্ভিদ, অচেনা রসায়নচক্র, নানারকম জ্যোতির্বিদ্যার চিহ্ন, আর এক রহস্যময় ভাষায় লেখা ছড়ানো-ছিটানো অনুচ্ছেদ।
এই অদ্ভুত বইটির মালিক হলেন এক বিরল বই সংগ্রাহক — উইলফ্রিড এম. ভয়নিক। তাঁর নামেই বইটির পরিচিতি হয় — Voynich Manuscript।
কিন্তু এ ছিল স্রেফ এক বই নয়, ছিল এক প্রকৃত রহস্যের কাব্য। যে কাব্য যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানী, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বইটির কোনো ভাষা এখনো পর্যন্ত ডিকোড করা যায়নি। কোনো বর্ণমালা মেলে না, কোনো ব্যাকরণ সুনির্দিষ্ট নয়। যেন এই লেখা পৃথিবীর নয়, ভিন্ন জগতের।
ভাষা যে কথা বলে না
বিশেষজ্ঞরা এটিকে বলছেন “একটি কনস্ট্রাক্টেড ল্যাঙ্গুয়েজ” বা কৃত্রিম ভাষা। আবার অনেকেই মনে করেন, এটি হতে পারে প্রাচীন কোনো লুপ্ত সভ্যতার চিহ্ন। কেউ কেউ দাবি করেন — এটি আসলে এক প্রতারণা, একজন প্রতারক তাঁর সারা জীবনের প্রহসন হিসেবে এটি তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু তারপরও প্রশ্ন জাগে — যদি প্রতারণা হয়, তবে এত নিখুঁতভাবে ২০০+ পৃষ্ঠা জুড়ে একই লিপি, অভিন্ন ধারা ও চিত্রশৈলী কীভাবে তৈরি সম্ভব?
অনেকেই মনে করেন, এই পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছিল ১৫শ শতকের শুরুতে। কার্বন ডেটিং মতে, পার্চমেন্ট তৈরি হয়েছিল আনুমানিক ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যে। কিন্তু লেখকের পরিচয় আজও অজানা। গবেষকরা নাম করেছেন — রজার বেকন, জন ডি, অথবা আলকেমিস্ট জ্যাকব সিনাপিউস… কিন্তু প্রমাণ নেই।
অজানা উদ্ভিদ, রহস্যময় নারী, জ্যোতির্বিদ্যার গোলকধাঁধা
বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়ানো রয়েছে এমন সব উদ্ভিদের চিত্র, যা পৃথিবীর কোনো উদ্ভিদবিজ্ঞান অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। ডাঁটা, পাতা, ফুল, মূল — সবকিছুই যেন এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। যেন প্রকৃতির সঙ্গে কল্পনার এক অজানা সংলাপ।
অনেক পৃষ্ঠায় দেখা যায় নগ্ন নারীদের, জলাশয়ের মধ্যে স্নানরত, রহস্যময় টিউবের মতো গঠন ঘিরে। কেউ বলেন, এগুলো মহিলাদের গর্ভধারণ বা প্রজননের প্রতীক। আবার কেউ মনে করেন, এগুলো কোনো আধ্যাত্মিক দর্শনের চিত্ররূপ।
আরও কয়েকটি অধ্যায় জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়নের অজানা সূত্রে ভরা — এমন গোলক ও ছক যা কোনো বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী মেলে না।
সীমান্ত পেরোনো ষড়যন্ত্র?
বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকে ধারণা করেছিলেন, এটি আসলে এক গুপ্ত বার্তা। কেউ মনে করেন, এটি হতে পারে প্রাচীন কোনো গুপ্ত গোষ্ঠীর প্রাচীন বিধান। আবার একটি মত আছে — বইটি তৈরি করেছিলেন কোনও যুগপৎ কবি ও ঔষধ প্রস্তুতকারী, যিনি চেয়েছিলেন তাঁর জ্ঞানের মূলে তৈরি একটি নিঃশব্দ প্রতিরূপ।
১৯৫০ থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে, বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে এই ভাষা ভাঙার। এমনকি ২০১৮ সালে কানাডার এক কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট দাবি করেন তিনি ৮০% কোড ভেঙে ফেলেছেন, তবে তা আজও বিতর্কিত।
চুপ করে বসে থাকা রহস্যের বই:
তবে এই বই শুধু এক ইতিহাস নয় — এক জীবন্ত ধাঁধা। একটি বই, যা কথা বলে না, কিন্তু বারবার আমাদের ভাবায়। এমনকি কিছুর দাবি, এই বইতে আছে এমন ঔষধের সূত্র যা আধুনিক বিজ্ঞান জানে না, এমন গর্ভনিরোধক ও অনন্ত যৌবনের উপায় লুকিয়ে আছে এর পাতায় পাতায়।
তবে যদি তাই হয়, কেন লেখক নিজের পরিচয় গোপন রাখলেন?
একটি পাণ্ডুলিপি, এক জগতের ছায়া
আজও এই বই রয়েছে Yale University এর Beinecke Rare Book & Manuscript Library-তে, সাধারণ দর্শনার্থীদের চোখের সামনে এক পুরু কাঁচের পেছনে সংরক্ষিত। কোনো উত্তর নেই, শুধু এক গভীর অভিব্যক্তি, এক অদ্ভুত আকর্ষণ — যেন বইটি নিজেই ডাকছে, বলছে, "ভেদ করো আমাকে, বুঝতে পারো কি সেই ভাষা যা ভাষাহীন?"
Voynich Manuscript-এর প্রকৃত রহস্য কী — তা হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না। কিন্তু এটাই তো রহস্যের আসল সৌন্দর্য, তাই না? যখন প্রশ্নই উত্তর হয়ে ওঠে, এবং এক টুকরো পার্চমেন্টও হয়ে ওঠে এক সমগ্র কল্পনার দরজা।
এই গল্প এক ইতিহাস নয় — এক আমন্ত্রণ। সেইসব কৌতূহলীদের উদ্দেশে, যারা অন্ধকারের বুকেও আলো খুঁজে বেড়ায়।
Copied