13/06/2026
#বিলাস পরিবহন #। এই পরিবহনে ভ্রমণের পূর্ব মুহূর্ত ও পরবর্তী মুহূর্তের মারাত্মক অভিজ্ঞতা শেয়ার না করে আর পারলাম না।
জীবনে কর্মের প্রয়োজনে দেশ-বিদেশের অনেক জায়গায় যেতে হয়, অনেক ভ্রমণ করতে হয়। কিন্তু গতকালকের (১২.০৬.২০২৬) ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটা সত্যিই ব্যতিক্রম ছিল। ঢাকা বাসার দরজা পার হতেই ও লিফটে উঠার পূর্ব মুহূর্তে পরিবারের সকল সদস্যদের কাছ থেকে খোদা হাফেজি করে বিদায় নিলাম। কিন্তু মনের মতো করে বিদায় নিতে পারলাম না। মনে একটা ছোটখাটো খটকা লাগছিল। কিন্তু কি আর করার। জীবনের প্রয়োজনে যাত্রা তো করতেই হবে।
নিচে নামতেই রাস্তায় একটি পিকআপ ও বাংলার টেসলা খ্যাত অটো রিক্সার চালকদের মধ্যে তুমুল গোলমাল দেখতে পেলাম। এদিকে প্রধান সড়কে (৬০ ফিট, মিরপুর) অনেক যানজট তৈরি হয়েছে। কেউ আমাকে মানুক বা না মানুক, কোথাও গোলমাল দেখলে আগ বাড়িয়ে সেখানে নাক গলানো ও মাতব্বারী করে সমাধানের চেষ্টা করার মতো বদ অভ্যাস আমার আগে থেকেই কিছুটা ছিল। যাহোক এখানেও ব্যতিক্রম হলো না। সবাইকে বুঝিয়ে, দূরে সরিয়ে দিয়ে ও যানজট মুক্ত করে পরবর্তীতে আমার গন্তব্যস্থল মহাখালী বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিলাম। প্রথমত বাসার নিচ থেকে রিক্সা নিয়ে আগারগাঁও বাংলাদেশ বেতারের সামনে পৌছালাম। সেখান থেকে একটি সিএনজি ভাড়া করতেই এক ব্যক্তি এসে বললেন ভাই ৩-৪ জন শেয়ারে যাওয়া যায় না? যেহেতু রাত একটু বেশি সেহেতু আমি আর ঝুকি নিলাম না। মহাখালী বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই আমাদের ফ্যাক্টরির প্রধান মেশিন সাপ্লাইয়ার, চাইনার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান FAMSUN এর দুইজন কর্মকর্তার সাথে আকর্ষিক দেখা হলো (Shabuj Ahmed & Shuva Ahmed)। তাদের আমাদের শ্রীমঙ্গল ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করতে আসার কথা ছিল কিন্তু এভাবে হঠাৎ একই পরিবহনে আসার মতো সম্ভাবনা তৈরি হবে এটা জানা ছিল না। আমাদের বাসের সময় প্রায় কাছাকাছি এবং সিট কাছাকাছি ছিল, ভাবছিলাম একই কোচ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে ভাবনায় গুড়ে বালি পড়লো। তাদের কোচ ভিন্ন ও আমার থেকে ২০ মিনিট পূর্বে ছিল। যাহোক, আমি তাদেরকে আমাদের শ্রীমঙ্গল ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে যাত্রাকে সাধুবাদ জানালাম আর আমার পরবর্তী পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। ইতিহাস তৈরি হলো এর পরেই।
আমার গাড়ির সময় চলে আসলেও গাড়ির দেখা আর পাই না। কিছুক্ষণ পর বাস কাউন্টারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে গাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানালেন যে গাড়ির একটি বেয়ারিং এর সমস্যা হয়েছে, বিশ মিনিট সময় লাগবে। আমি জানালাম সমস্যা নাই, সেফটি ফার্স্ট। এটি আমাদের কর্মজীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বাক্য যার উপর আমাদের অনেকেরই হর হামেশাই আমল করা লাগে। যেহেতু সেফটি ফার্স্টের কাজ চলছে সেহেতু সেখানে থাকা একটি স্ট্যান্ড প্যাডেস্টাল ফ্যানে শরীরটা ঠান্ডা করার চেষ্টা করলাম। এই ফ্যানের কিছুটা দূরেই ছিল বাসস্ট্যান্ডের আরেকটি গেট। যেখান থেকে ডেঙ্গু মশা মারার ফগিং/ধোঁয়ার মতো উৎপত্তি সৃষ্টি হলো এবং ফ্যানের বাতাসে টেনে সেটি আমি ও আমার মতো অপেক্ষমান অনেক প্যাসেঞ্জারের গায়ে এসে পড়লো। এই ধোঁয়া যাতে আমাদের দিকে না আসে সেজন্য ফ্যানটি ঘুরিয়ে দিলাম এবং একটু পরেই দেখলাম কাউন্টারের লোকজন অনেক জোরে চিল্লাপাল্লা করছে ও গেটের ওপাশে যারা ছিল তাদেরকে বকাঝকা করছে। তখনো বুঝিনি আসলে ব্যাপারটা কি। একজন প্যাসেঞ্জার আমাকে বললো, ভাই আপনার মুখ তো কালিতে ভরে গেছে। আমিও বললাম, ভাই আপনারও তো অবস্থা খারাপ। পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম, ওটা আসলে কোন মশা মারার ধোঁয়া না। এটি ছিল গাড়ির সাইলেন্সার বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি থেকে সৃষ্ট কালি। যার তাণ্ডবে আমাদের মতো লোকজনের সুন্দর পোশাক পরে ভদ্র মানুষ সাজার ব্যাপারটি একেবারে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলো। সাথে সাথে পকেটে থাকা টিস্যু ও বোতলের পানি দিয়ে হাত, মুখ ও মাথা পরিষ্কারের চেষ্টা করলাম। কিন্তু তেমন ফল পেলাম না। ব্যাগের ভিতরে রাখা কিছু টিস্যু দিয়েও কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।
এরই মধ্যে আমাদের কাঙ্ক্ষিত গাড়ির প্যাসেঞ্জারদের ডাক পড়লো। বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জারের অবস্থাই আমার মতো কালিময়। এসির গাড়ির ভিতরে ব্ল্যাঙ্কেট/কম্বল থাকে, সেটির ঘষাঘষিতে কিছুটা কালি দূর হয়েছে ভেবেছিলাম। কিন্তু সে ভাবনাটাও বিফল হলো যখন গাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি রেস্টুরেন্টে পৌঁছালো। সেখানে পূর্বে রওনা দেওয়া সাদেকুল ও শুভর সাথে দেখা হয়ে গেলো। তারা যে আমাকে ঠিকঠাক চিনতে পেরেছিল সেজন্য তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাদের মুখেও একই কথা- স্যার, আপনার মুখে তো কালি। প্রথমে একটু লজ্জা লাগলেও পরক্ষণে তা ঝেড়ে ফেললাম। ভাবলাম, গাড়ির ভেতরে অনেকের অবস্থাই তো আমার মতো।
এপর্যন্ত তবুও একটি অবস্থার মুখোমুখি ছিলাম কিন্তু আরেকটি ইতিহাস তৈরি হয়ে গেলো যখন দেখলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শ্রীমঙ্গল আসতে আমার প্রায় ২ ঘন্টার রাস্তা ৮ ঘন্টা লেগেছে। খারাপ রাস্তা, প্রচুর বৃষ্টি ও যানজটের মধ্যে যে অবর্ণনীয় কষ্ট হয়েছে তা উক্ত ঘটনাগুলো স্মরণ করলে সবকিছু মলিন হয়ে যায়।
সর্বশেষ অনুভূতি একটাই- পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি ভালো না হলে শুধুমাত্র রাস্তা না, সারা জীবনটাই কালিময় হতে পারে😭।
"একা ছিলাম ছিলাম ভালো, ছিলনা তো জ্বালা। তোমার কথা না শুনিয়া জীবন হলো কালা" Karima Mou
তাই, সবারই বাসা থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি সুন্দর হোক, ভালো হোক, এই কামনাই করি।