22/05/2026
থাইল্যান্ডের শেষ টাইটান ডাইনোসর আবিষ্কার
=============================
সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডে অবস্থিত Chaiyaphum প্রদেশে ডায়নোসর খুঁজে পেয়েছেন। এটি হলো Nagatitan chaiyaphumensis, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃহত্তম পরিচিত ডায়নোসর।
ছোটবেলায় জুরাসিক পার্ক সিনেমা কিংবা কোনো কার্টুন চরিত্রে ডায়নোসরের মুক্ত বিচরণের কথা মনে করলে আমাদের কাছে মনে হতো এটি এক বিশালদেহী কিংবা আক্রমণাত্মক প্রাণী। বাস্তবে এর জীবন্ত অস্তিত্ব না থাকায় এটি কাল্পনিক মনে হলেও এটি ছিল প্রাগৈতিহাসিক মেসোজোয়িক যুগে পৃথিবীতে বাস করা বিশাল আকৃতির সরীসৃপ প্রাণীদের একটি বিলুপ্ত প্রজাতি। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এ প্রাণীর পর্দার গল্প থেকে বের করে বাস্তবে জানার মধ্যে রয়েছে এর ইতিহাস আর অস্তিত্ব উদ্ধার করা এবং বিজ্ঞানীদের অনন্ত পরিশ্রম, বছরের পর বছর ধরে চলা ক্লান্তিহীন গবেষণা ও বিজ্ঞান জগতের অন্যতম কঠোর সাধনার গল্প।
আমেরিকার Rowan University এর Paleontology বা জীবাশ্মবিদ্যার অধ্যাপক Dr. Kenneth Lacovara এর ভাষায় ডায়নোসরের বিভিন্ন প্রজাতির একের পর এক হাড় খুঁজে পাওয়া ছিল, ‘Holy Grail'! কিন্তু একটি ডায়নোসরের হাড় খুঁজে পাওয়া আসলে এ গল্পের কেবল একটি অংশই বলে। এই আশ্চর্যজনক প্রানীগুলোর কঙ্কালের চেয়েও আরও কিছু আছে যা বিস্তারিতভাবে তাদের অস্তিত্বের বিবরণ দিতে সাহায্য করে, যা সিনেমাগুলোকে অনেক শৈল্পিক স্বাধীনতা দেয়। এখানে ডায়নোসরের রঙ, এমনকি আচরণও কাল্পনিক।
বর্তমানে অসাধারণ ও নতুন জীবাশ্ম আবিস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রাগৈতিহাসিক জগতের উপর এমন জানালা খুলে দিচ্ছে যা আগে কখনো দেখা যায় নি। যায় ফলশ্রুতিতে লক্ষ লক্ষ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা ডায়নোসরদের রঙ, এমনকি তারা কীভাবে জীবনযাপন করত তা সম্পর্কে জানতে পেরেছে। তাদের মতে, আমরা এখন ডায়নোসর যুগের সত্য উন্মোচনের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি কাছাকাছি।
প্রশ্ন জাগতে পারে যে কীভাবে ডায়নোসরের হাড়গুলো খুঁজে পাওয়া যায়। আসলে পৃথিবী ভূতাত্ত্বিকভাবে মানচিত্রায়িত। আর তাই ডায়নোসর খুঁজে পেতে হলে ট্রায়াসিক অর্থাৎ, বিখ্যাত জুরাসিক বা ক্রিটেশিয়াস যুগের শিলা খুঁজে পেতে হয়।
গবেষকরা মূলত Nagatitan কঙ্কালের অবশেষ আবিষ্কার করেছেন, যা সওরোপড (Sauropod) নামক ডায়নোসর বংশের সদস্য। Nagatitan লম্বা গলা, লম্বা লেজ, ছোট মাথা ও চারটি স্তম্ভাকার পায়ের জন্য পরিচিত। বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েক বছর ধরে এর মেরুদণ্ড, পাঁজরের হাড়, শ্রোণীচক্র এবং পায়ের হাড় খনন করে বের করেন, যার মধ্যে সামনের পায়ের একটি হাড়, হিউমেরাস, যার দৈর্ঘ্য ছিল ১.৭৮ মিটার। এর হিউমেরাস এবং ফিমার (পশ্চাৎপদের সংশ্লিষ্ট হাড়)-এর আকারের উপর ভিত্তি করে গবেষকরা নাগাটাইটানের দেহের ভর ২৫ থেকে ২৮ টন বলে অনুমান করেছেন। এর মোট দৈর্ঘ্য ৮৮ ফুট (২৭) মিটার। উদ্ধারকৃত জীবাশ্মগুলোর মধ্যে এর মাথা এবং দাঁত পাওয়া যায়নি।
University College, London এর Paleontology বিভাগের ডক্টরাল ছাত্র এবং 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' এর Main Author হলেন Thitiwoot Sethapanichsakul. তিনি বলেন, "নাগাটাইটান সম্ভবত এমন একটি প্রাণী ছিল যা প্রচুর পরিমাণে এমন গাছপালা খেত যেগুলোতে চিবানোর প্রয়োজন হতো না বা খুব কম হতো, যেমন কনিফার এবং সম্ভবত বীজ ফার্ন।"
জলবায়ু সম্ভবত উপক্রান্তীয় ছিল, যেখানে কিছু বনভূমির পাশাপাশি সাভানার মতো এবং গুল্মময় আবাসস্থলও ছিল। Nagatitan বিভিন্ন অন্যান্য ডাইনোসরের পাশাপাশি Pterosaur নামক উড়ন্ত সরীসৃপদের সাথেও বাস করত। নদীগুলো কুমির এবং মিঠা পানির হাঙ্গরসহ বিভিন্ন মাছে পরিপূর্ণ ছিল। বাস্তুতন্ত্রের বৃহত্তম শিকারী প্রাণীটি ছিল আফ্রিকার বিশাল মাংসাশী ডাইনোসর Carcharodontosaurus এর এক আত্মীয়, সম্ভবত প্রায় আট মিটার লম্বা এবং ভর প্রায় ৩.৫ টন।
প্রধান গবেষক Thitiwoot Sethapanichsakul বলেন, "এই আকারে এটি Nagatitan এর তুলনায় খুবই ছোট ছিল। পূর্ণ আকারে, শিকারের দিক থেকে নাগাটাইটানের সম্ভবত ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছুই ছিল না।"
Thitiwoot বলেন, "আমাদের আবিষ্কৃত ডাইনোসরটি বেশিরভাগ মানুষের মানদণ্ডেই বড় ছিল।এটির ভর সম্ভবত Diplodocus এর চেয়ে অন্তত ১০ টন বেশি ছিল।" University College, London এর তথ্যমতে, এই থাই পিএইচডি শিক্ষার্থী সদ্য আবিষ্কৃত Sauropod "শেষ টাইটান" বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি থাইল্যান্ডের অন্যতম নবীন শিলাস্তরের একটি থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, "অঞ্চলটি পরে একটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল, তাই এটিই হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমাদের খুঁজে পাওয়া শেষ বা সবচেয়ে সাম্প্রতিক Sauropod।"
University College, London এর Paleontologist এবং এই গবেষণার Co-author হলেন Paul Upchurch। তিনি বলেন, "প্রকৃতপক্ষে, Sauropod রা ডিম ফুটে বের হওয়ার পর খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেত বলে জানা যায়, এবং এটি সম্ভবত শিকারিদের বিপদের সাথে সম্পর্কিত।Sauropod রা যত তাড়াতাড়ি বড় হতে পারত, তারা তত বেশি নিরাপদ থাকত কারণ তাদের মোকাবেলা করা আরও কঠিন হতো।"
পৃথিবীর ইতিহাসে Sauropod দের মধ্যে বৃহত্তম স্থলচর প্রাণী অন্তর্ভুক্ত ছিল। Nagatitan যেকোনো মানদণ্ডেই বিশাল ছিল, কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার কিছু সরোপড যেমন Argentinosaurus এবং Patagotitan এর মতো বিশাল ছিল না, যেগুলো ৩০ মিটারের বেশি লম্বা ছিল।
Nagatitan নামটি এসেছে Naga থেকে, যা কিছু এশীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি সর্প-সদৃশ প্রাণী এবং বিভিন্ন থাই মন্দিরে এর উল্লেখযোগ্য চিত্র অঙ্কিত আছে। সব মিলিয়ে, থাইল্যান্ড থেকে ১৪টি নামযুক্ত ডাইনোসরের সন্ধান পাওয়া গেছে।
বেশ কয়েকটি বৃহৎ Sauropod এর নামের মধ্যে ‘Titan’ শব্দটি রয়েছে।Thitiwoot বলেছেন, Nagatitan কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ ‘Titan’ বলাটা হয়তো উপযুক্ত হবে, কারণ ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষের দিকে অঞ্চলটি একটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল, যার অর্থ সেখানে আর কোনো Sauropod বাস করত না। Nagatitan এই অঞ্চলের Sauropod এর বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খুব বেশি Sauropod এর সন্ধান পাওয়া যায়নি, এবং Nagatitan তাদের মধ্যে বৃহত্তম ও ভূতাত্ত্বিকভাবে নবীনতম। Nagatitan হচ্ছে Sauropod এমন একটি উপগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের হাড়ে প্রচুর অভ্যন্তরীণ বায়ুথলি এবং পাতলা প্রাচীর ছিল, যা তাদের কঙ্কালকে হালকা করত।
এই গোষ্ঠীটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ১৪০ মিলিয়ন বছর আগে, এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ৯০ মিলিয়ন বছর আগে বিশ্বজুড়ে একমাত্র অবশিষ্ট Sauropod এ পরিণত হয়। ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর যুগের সমাপ্তি পর্যন্ত তারা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।
Nagatitan এমন এক সময়ে বাস করত যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বাড়ছিল, যা উচ্চ বৈশ্বিক তাপমাত্রার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। Upchurch বলেন, "এই সময়ে Sauropod রা বিশেষভাবে বড় হয়ে উঠেছিল বলে মনে হয়, দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, সম্ভবত উত্তর আফ্রিকায় বিশাল আকারের সওরোপডরা বাস করত এবং এখন Nagatitan এর মতো বেশ বড় আকারের একটি প্রাণী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়।" তিনি আরো বলেন, ‘বড় শারীরিক আকার এবং উচ্চ জলবায়ুগত তাপমাত্রার মধ্যে এই সম্ভাব্য সম্পর্কটি পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তবে সম্ভবত উচ্চ তাপমাত্রা সেইসব উদ্ভিদজাত খাদ্যের উপর প্রভাব ফেলেছিল যা Sauropod দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তারা ছিল খুব বড় আকারের তৃণভোজী প্রাণী। Nagatitan শারীরিক আকারের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছানোর পূর্ববর্তী সময়কালের একটি আভাস দেয়।"
ক্রিটেসিয়াস যুগের Nagatitan chaiyaphumensis নামক এই ডাইনোসরের জীবাশ্মটি প্রথম দেখতে পান থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব প্রদেশ চাইয়াফুমের একজন গ্রামবাসী। তার ই সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃহত্তম পরিচিত ডায়নোসরের রহস্য উদঘাটন করেন।
আধুনিক জীবাশ্মবিদগণ বর্তমান সময়কে ডায়নোসর আবিস্কারের এক নবজাগরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা প্রযুক্তি আমাদের খুঁজে পাওয়া জীবাশ্মগুলো থেকে আরও বেশি বিস্তারিত তথ্য বের করে আনতে সাহায্য করছে। যা এই সত্যের কাছাকাছি চলে এসে ডায়নোসর নামক প্রানীদের সেই মর্যাদা দিতে সাহায্য করে, যা তারা যোগ্যতার সাথেই অর্জন করেছে। যার ফলে Pop Culture এ ডায়নোসরদের যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়, তা বদলে দেবে।
লিখেছেন - নুসরাত জাহান, ট্যকিয়ন