14/08/2026
মাধ্যাকর্ষণ দিয়েই কি অনবরত বিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব?
‘জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ’, ‘একবার চালু করলে নিজে নিজেই চলবে’—এ ধরনের ধারণা নতুন নয়। শত শত বছর ধরেই মানুষ এমন একটি যন্ত্রের স্বপ্ন দেখে এসেছে, যা বাইরে থেকে আর কোনো শক্তি না নিয়েই অনবরত কাজ করবে। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ধারণাকে বলা হয় Perpetual Motion Machine বা স্বয়ংচল যন্ত্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশের আবদুর রহমান সুহাইলের একটি দাবি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলা ভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর উদ্ভাবিত ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এক টনের একটি বস্তুকে এক মিটার ওপর থেকে নামালে সেটি মাধ্যাকর্ষণের কারণে নিচে নামার সময় শক্তি উৎপন্ন করবে। সেই শক্তি লিভার ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজে লাগানো হবে।
এখানে তাঁর ধারণার দ্বিতীয় অংশটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুহাইলের দাবি অনুযায়ী, বস্তুটি নিচে নামার সময় শক্তি দেওয়ার পর সেটিকে আবার ওপরে তুলতে হবে। কিন্তু তাঁর নকশায় এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বস্তুটি ওপরে ওঠার সময় তার “ওজন নিজে নিজেই শূন্য হয়ে যাবে”। ফলে নিচে নামার সময় শক্তি পাওয়া যাবে, কিন্তু ওপরে তোলার জন্য সমপরিমাণ শক্তি খরচ করতে হবে না—এভাবেই তাঁর দাবি অনুযায়ী ইঞ্জিনটি ৩৬০ ডিগ্রিতে অনবরত ঘুরতে থাকবে।
শুনতে চমকপ্রদ হলেও এখানেই আসে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একটি বস্তুকে নিচে নামিয়ে যে শক্তি পাওয়া গেল, সেই বস্তুটিকে আবার একই উচ্চতায় তুলতে প্রয়োজনীয় শক্তি আসবে কোথা থেকে?
ধরা যাক, এক টনের একটি বস্তু এক মিটার নিচে নামানো হলো। তার মহাকর্ষীয় বিভব শক্তির পরিবর্তন আনুমানিক mgh = ১,০০০ × ৯.৮ × ১ ≈ ৯,৮০০ জুল। বস্তুটি নিচে নামার সময় সর্বোচ্চ এই পরিমাণ শক্তিই পাওয়া যেতে পারে—তাও বাস্তব যন্ত্রে ঘর্ষণ, বিয়ারিং, গিয়ার, লিভার ও জেনারেটরের ক্ষতির কারণে এর পুরোটাও বিদ্যুতে রূপান্তরিত হবে না।
এখন সেই একই বস্তুকে আবার এক মিটার ওপরে তুলতে গেলে অন্তত প্রায় একই পরিমাণ মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি ফিরিয়ে দিতে হবে। বাস্তব ব্যবস্থায় ক্ষতির কারণে প্রয়োজন হবে আরও বেশি ইনপুট শক্তি। অর্থাৎ নিচে নামার সময় ৯,৮০০ জুলের কাছাকাছি শক্তি পাওয়া গেলেও, সেটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে এনে একই চক্র পুনরাবৃত্তি করতে গেলে বিনা খরচে শক্তি পাওয়া যাবে না।
আর এখানেই “ওজন শূন্য হয়ে যাওয়ার” দাবিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বস্তু কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আপাত ওজনহীনতা অনুভব করতে পারে—যেমন মুক্তপতনের সময়—কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ থেকে একটি বস্তুকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে সেটিকে ওপরে তুলতে কোনো শক্তি লাগবে না, এমন কোনো সাধারণ পদার্থবৈজ্ঞানিক নীতি নেই। এই দাবির জন্য সুনির্দিষ্ট যান্ত্রিক ব্যাখ্যা ও পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা জরুরি। শক্তি সংরক্ষণ সূত্র অনুযায়ী শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না; এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়। তাই মাধ্যাকর্ষণ থেকে শক্তি পাওয়া অসম্ভব বা নতুন কিছু নয়—জলবিদ্যুৎকেন্দ্রই তার বাস্তব উদাহরণ। কিন্তু সেখানে পানি উচ্চতায় ওঠে কীভাবে? বৃষ্টি ও জলচক্রের মাধ্যমে সূর্যের শক্তি ব্যবহৃত হয়। পানি নিচে নামার সময় তার সঞ্চিত বিভব শক্তি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ এটি “ফ্রি” শক্তি নয়; একটি বৃহত্তর শক্তিচক্রের অংশ।
একইভাবে, কোনো ভারী বস্তু নিচে নামিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা নিজে থেকে অসম্ভব নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন বলা হয়—সেই বস্তুটিকে আবার আগের জায়গায় তুলতেও কোনো শক্তি লাগবে না এবং এভাবে চক্রটি অনন্তকাল চলবে। তখন পুরো সিস্টেমের শক্তির হিসাব দেখাতে হবে।
এখানে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব শক্তি রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় ঘর্ষণসহ বিভিন্ন কারণে শক্তির কার্যকর ব্যবহারযোগ্যতা কমে যায়; কোনো বাস্তব চক্রের দক্ষতা ১০০ শতাংশের বেশি হতে পারে না।
সুতরাং প্রশ্নটি “মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায় কি না?”—এটা নয়। অবশ্যই যায়। আসল প্রশ্ন হলো, একটি বন্ধ যান্ত্রিক চক্রে কোনো বাহ্যিক শক্তির উৎস ছাড়াই মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে নিট শক্তি পাওয়া সম্ভব কি না। প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এর উত্তর না।
সুহাইল সাক্ষাৎকারে আরও জানিয়েছেন, তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করে লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছেন এবং সহায়তার আশ্বাস পেয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর আপডেট পাননি। এই প্রশাসনিক বিষয়টি আলাদা; কোনো সরকারি দপ্তরে প্রস্তাব জমা দেওয়া বা সহায়তার আশ্বাস পাওয়া নিজে থেকে প্রযুক্তিটির বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রমাণ করে না।
আর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে তাঁর প্রোটোটাইপ। যদি সত্যিই এমন একটি ইঞ্জিন তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চালিয়ে সম্পূর্ণ ইনপুট-আউটপুট শক্তির হিসাব, দীর্ঘ সময়ের স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পুনরাবৃত্তিযোগ্য পরীক্ষার সামনে আনতে হবে।
কারণ বিজ্ঞানে অসাধারণ দাবি মানেই অসাধারণ প্রমাণের প্রয়োজন। একটি যন্ত্র কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিট ঘুরতে পারা আর বাইরের কোনো শক্তি ছাড়া নিজে নিজে অনবরত শক্তি উৎপাদন করতে পারা—এই দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
তাই এখনই এটিকে “ফ্রি এনার্জির আবিষ্কার” বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি শুধু দাবি শুনে বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়াও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। প্রোটোটাইপটি যদি সত্যিই দাবি অনুযায়ী কাজ করে, তবে তার শক্তির হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সংবাদ উৎস: বাংলাভিশন।