09/09/2024
কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিলিয়ন ডলার পাচার!
রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার করেছে। আর এ কাজটি করেছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আহমদ কায়কাউসসহ বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট।
এ সিন্ডিকেট বিশেষ আইনে, বিনা দরপত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়াই তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আওয়ামী সমর্থক ব্যবসায়ীদের রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুবিধা দেয়। বছরের পর বছর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চালানো হলেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে এগুলোর মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে ভরেন।
ক্যাপাসিটি চার্জের টাকায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দেন।
যারা এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেন সেই সিন্ডিকেটের প্রভাবশালীরাও বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, ক্যাপাসিটি চার্জের বিলের নামে গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে।
যার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ তৎকালীন সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিনির্ধারক এবং সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পকেটে চলে যায়। ঠিক কী পরিমাণ অর্থ এখন পর্যন্ত এ কাজে বিদেশে পাচার হয়েছে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড।
কিন্তু এত দিন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের প্রিয় লোকদের আবদার পূরণে বিদ্যুৎ না নিয়েও ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে। এর বিনিময়ে তৎকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সুবিধাভোগী বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা অর্থ সুবিধা দিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যুৎ দেওয়া ছাড়াই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিল নেওয়ার মতো মারাত্মক অনিয়ম আর কিছু নেই।
ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যে বিপুল পরিামণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে তা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, এ টাকা দেশের নাগরিকদের।
তারা আরও বলেন, কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়া এসব রেন্টাল আর কুইক রেন্টালের লাইসেন্স তুলে দেওয়া হয় দেশের প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর কাছে। এর মধ্যে ছিল সামিট গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, ইউনাইটেড গ্রুপ, কনফিডেন্স গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, ইউনিক গ্রুপ, বারাকাসহ অন্যান্য কোম্পানি।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকার বিনা টেন্ডারে দায়মুক্তি আইনের আওতায় একসময়ে উচ্চমূল্যের রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল। ২০১০ সালে বলা হয়েছিল, এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র আপৎকালীন চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু গত দেড় দশকেও এগুলো আর বন্ধ করা যায়নি।
পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, শেখ হাসিনা ছিলেন তৎকালীন সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রী আর নসরুল হামিদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। গত কয়েকটি মেয়াদে তারা এ মন্ত্রণালয় হাতছাড়া করেননি। কারণ, এ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রচুর টাকা বরাদ্দ হয়। আর এ টাকার ভাগ শেখ হাসিনা ও নসরুল হামিদ যেভাবেই হোক বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। দেশের অ্যাকাউন্টে তারা এ অর্থ রাখেননি। তারা বেশির ভাগ অর্থই বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন।
একইভাবে সামিট গ্রুপের আজিজ খানের মতো ব্যবসায়ী যারা এসব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সুবিধা নিয়েছেন তারাও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় এ বিপুল অর্থ পাচার করে দিয়েছেন। এর সঙ্গে আরও জড়িত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা, পিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তারাও। এ ছাড়া যে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা জেনেশুনে এ অবৈধ কাজ করেছেন তাদের উৎসাহেই শেখ হাসিনা ও নসরুল হামিদরা দুর্নীতি করেছেন।
এজন্য এই দুর্নীতিমূলক কর্মকান্ডে এ ব্যবসায়ীরাও সমানভাবে দায়ী। এদের অনেকেই এখন পলাতক। তারা অন্যায় করেছেন বলেই পালিয়ে গেছেন, তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে লুট করে এ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন, নিশ্চয়ই তারা ধরাও পড়বেন। আমি আশঙ্কা করছি, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে।
বিল পরিশোধ হয় ডলারে : ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-কে যে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে এ বিলের পুরোটাই ডলারে দিতে হয়েছে। রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ডলারেই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। রেন্টাল-কুইক রেন্টালের পর বেসরকারি খাতে বেশকিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) নামক এসব কেন্দ্রের ক্যাপসিটি চার্জ সরাসরি ডলারে পরিশোধ করা হয় না।
তবে আইপিপিগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারের বিনিময় হার ধরে টাকায় পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে বিনিময় হার নির্ধারিত হয় সোনালী ব্যাংকের বিনিময় হারে। ফলে সরাসরি ডলার না পেলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ এখানে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ দিতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে টাকার অবমূল্যায়নে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা ডলারে পাওয়া এই বিল বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন।
যেভাবে দুর্নীতি : দেশে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই। তবে ক্যাপাসিটি চার্জের হার নির্ধারণে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জড়িত উদ্যোক্তাদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দরকষাকষির ভিত্তিতে বছরভিত্তিক ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়। কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়া সরাসরি লাইসেন্স দেওয়ায় এমনিতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি ধরা হয়েছে। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জের হারও অনেক বেশি। তবে এসব কেন্দ্রের চুক্তি বারবার নবায়ন করে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে তাদের মূলধনি ব্যয়ের কয়েকগুণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
এ সুযোগে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলো সব ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো একাধিকবার সরকারের কাছে বিক্রি করেছেন মালিকরা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে বেশ কিছু কোম্পানি। অন্যদিকে শুরুতে তিন বছর মেয়াদে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে এগুলোর মেয়াদ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, এসব কেন্দ্রের মোট বিনিয়োগের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিনিয়োগকারী দেয়, বাকিটা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে মেটানো হয়। পিডিবি তথা সরকার সুদসহ সেই ঋণ (চুক্তি অনুযায়ী) তিন বছরে শোধ করে দেয়। পাশাপাশি ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টের ওপর দেওয়া হয় মুনাফা (রিটার্ন অব ইক্যুইটি)। সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় শোধ করে দিলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রটা ওই কোম্পানিরই রয়ে যায়। পরে মেয়াদ বাড়ানো হলেও একই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে ফের নির্মাণ ব্যয় পরিশোধ করা হয়। তা আগের চেয়ে কিছুটা কম। এভাবেই রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়।