11/06/2026
আমাদের অফিসে একজন লোক দরকার ছিল। বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে, পদের নাম "সিনিয়র এক্সিকিউটিভ।"
এই পদের কাজ কী, কেউ জানে না। বস সালেহ সাহেব নিজেও হয়তো জানেন না। জব পোস্টিংয়ে লিখেছিলেন, "মাল্টিটাস্কার হতে হবে, টিম প্লেয়ার হতে হবে, আউট অফ দ্য বক্স থিংকার হতে হবে।"
আমি দেখে বললাম, "স্যার, এটা মানুষের বিজ্ঞাপন না কি সুপারহিরোর অডিশন?"
বস বললেন, "এগুলো কর্পোরেট ল্যাঙ্গুয়েজ। আপনি বুঝবেন না।"
বাধ্য হয়ে তিনশোর বেশি সিভি পড়লাম। এই তিনশো সিভি পড়ার পর আমার উপলব্ধি হলো — বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ নিজেকে "ডায়নামিক, প্রোঅ্যাকটিভ, রেজাল্ট-ওরিয়েন্টেড প্রফেশনাল" মনে করে। এবং প্রত্যেকের হবি হলো "ট্রাভেলিং, রিডিং আর মিউজিক।"
একজনের সিভিতে লেখা ছিল, "হবি: নিজেকে উন্নত করা।"
আমি সিভিটা আলাদা করে রাখলাম। এই লোককে দেখতে চাই। (যদিও তাকে ডাকা হয় নাই)
---
# # ইন্টারভিউর দিন
সকাল দশটায় শুরু হওয়ার কথা। বস এলেন সাড়ে দশটায়। হাতে কফি, চোখেমুখে ঘুম।
বললেন, "শুরু করেন।"
বললাম, "স্যার, ক্যান্ডিডেট বাইরে বসে আছে।"
বললেন, "একটু অপেক্ষা করুক। ধৈর্য পরীক্ষাও ইন্টারভিউর অংশ।"
মনে মনে বললাম, স্যার আপনি দেরি করে এসে এখন দর্শন বলছেন।
---
# # প্রথম ক্যান্ডিডেট — তানভীর
ঢুকলো। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। গায়ে এত পারফিউম যে চোখ পর্যন্ত জ্বালা ধরে গেলো। স্যুট পরেছে। টাই পরেছে। চুল এমনভাবে আঁচড়ানো যে মনে হচ্ছে প্রতিটা চুল আলাদাভাবে বসানো হয়েছে।
বস জিজ্ঞেস করলেন, "নিজের সম্পর্কে বলুন।"
তানভীর শ্বাস নিলো। তারপর শুরু করলো।
"স্যার, আমি একজন ডায়নামিক, প্রোঅ্যাকটিভ, রেজাল্ট-ওরিয়েন্টেড প্রফেশনাল। আমি বিশ্বাস করি টিমওয়ার্কে। আমি আউট অফ দ্য বক্স থিংক করতে ভালোবাসি। আমার লক্ষ্য হলো কোম্পানির ভিশনের সাথে নিজের মিশন অ্যালাইন করে সিনার্জি ক্রিয়েট করা।"
পুরো ঘরে নীরবতা।
আমি বুঝলাম না সে কী বললো। বস-ও মনে হয় বুঝলেন না। সম্ভবত তানভীর নিজেও বোঝেনি।
বস মাথা নাড়লেন। বললেন, "চমৎকার।"
আমি কলম রেখে দিলাম।
বস জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার দুর্বলতা কী?"
তানভীর আবার শ্বাস নিলো। এই প্রশ্নের জন্য সে প্রস্তুত ছিল।
"স্যার, আমি একটু বেশি পারফেকশনিস্ট। কাজ একদম নিখুঁত না হলে ছাড়তে পারি না। অনেক সময় রাত তিনটা পর্যন্ত কাজ করি শুধু একটা প্রেজেন্টেশনের ফন্ট ঠিক করতে।"
আমি ভেতরে ভেতরে মরে গেলাম।
এই উত্তর পৃথিবীর সব ইন্টারভিউতে দেওয়া হয়। এটা দুর্বলতা না, এটা দুর্বলতার পোশাক পরা অহংকার।
বস বললেন, "আহা, এমন ডেডিকেটেড কর্মী-ই দরকার আমাদের।"
তানভীর বিনয়ের হাসি দিলো। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।
বস জানতে চাইলেন, "পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?"
তানভীর একটুও না থেমে বললো, "স্যার, পাঁচ বছর পর আমি এই কোম্পানির একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে চাই। আপনার ভিশনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।"
বস আবেগে প্রায় গলে গেলেন।
আমি ভাবলাম — পাঁচ বছর পর এই লোক এখানে থাকবে না। ছয় মাস পরই রিজাইন দেবে। কিন্তু এখন যা বলেছে তা শুনতে এত মিষ্টি যে সত্যি মনে হচ্ছে।
---
# # দ্বিতীয় ক্যান্ডিডেট — মিতু
মিতু ঢুকলো। হাতে ম্যাকবুক। কাঁধে যে ব্যাগটা এনেছে, তার দাম আমার এক মাসের বেতনের সমান।
বস প্রশ্ন করলেন, "আপনার সিভিতে দেখলাম পাঁচ বছরে পাঁচটা কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। এত জায়গা বদলালেন কেন?"
মিতু একটুও না ঘাবড়ে বললো, "স্যার, আমি গ্রোথ-মাইন্ডেড। যেখানে লার্নিং কার্ভ ফ্ল্যাট হয়ে যায়, সেখানে থেকে আমার পটেনশিয়াল ওয়েইস্ট করতে চাই না।"
(অনুবাদ: কাজের কাজ পারি না, তাই ধরা পড়লেই চম্পট)
বস মাথা নাড়লেন। "এটা ভেরি প্রফেশনাল অ্যাটিটিউড।"
আমি চায়ের কাপ তুললাম।
মিতু বললো, "স্যার, আমি জয়েন করার আগে কিছু জানতে চাই।"
বস বললেন, "অবশ্যই।"
মিতু ম্যাকবুক খুললো। ভেতর থেকে একটা লিস্ট বের করলো।
"ওয়ার্ক ফ্রম হোম পলিসি কী? ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং আওয়ার আছে? মেডিকেল কাভারেজ কতটুকু? অ্যানুয়াল বোনাসের স্ট্রাকচার কী? পেইড লিভ কতদিন? কনভেয়ান্স অ্যালাউন্স আছে?"
বস একটু থতমত খেয়ে বললেন, "এগুলো পরে আলোচনা হবে।"
মিতু বললো, "স্যার, এগুলো না জানলে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না।"
ইন্টারভিউতে যে প্রশ্ন করতে আসে, সে চাকরি পাচ্ছে না। কিন্তু এই সত্য কেউ বলে না।
বস বললেন, "আমরা জানাবো।"
মিতু ম্যাকবুক বন্ধ করলো।
---
# # তৃতীয় ক্যান্ডিডেট — রফিক
রফিক ঢুকলো। সাধারণ শার্ট। হাতে পুরনো একটা ফাইল। ঢুকতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা খেলো। চেয়ারে বসতে গিয়ে প্রায় পড়ে গেলো।
বস জানতে চাইলেন, "নিজের সম্পর্কে বলুন।"
রফিক বললো, "স্যার, আমি রফিক। মিরপুরে থাকি। মা-বাবা আছেন। একটা ছোট বোন আছে। আমি খুব একটা দ্রুত কাজ করতে পারি না, তবে একবার বুঝলে আর ভুলি না।"
ঘরে সুনসান নীরবতা।
বস কপাল কুঁচকালেন। "আর কিছু?"
রফিক একটু ভেবে বললো, "স্যার, আমি মিথ্যা বলতে পারি না। এটা অনেক সময় সমস্যা করে।"
বস আমার দিকে তাকালেন। আমি নোট নিলাম।
বস জিজ্ঞেস করলেন, "পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?"
রফিক বললো, "স্যার, সত্যি বলতে জানি না। পাঁচ বছর পর কী হবে কেউ জানে? আমি শুধু জানি এখন ভালো কাজ করতে চাই।"
বস মুখ শক্ত করলেন।
আমি বুঝলাম, এই লোক চাকরি পাবে না।
---
# # ইন্টারভিউ পরবর্তী আলোচনা
বস বললেন, "তানভীর ছেলেটাকে নেওয়া যায়।"
বললাম, "স্যার, রফিক—"
বস হাত তুললেন। "কমিউনিকেশন স্কিল নেই। কর্পোরেটে ইমেজ ইজ এভরিথিং।"
বললাম, "স্যার, মিতু?"
বস বললেন, "ও তো আমারই ইন্টারভিউ নিলো।"
এই একটা বিষয়ে বসের সাথে একমত হলাম।
---
# # তিন মাস পর
তানভীর জয়েন করেছে। প্রথম সপ্তাহে এসেছিল স্যুট পরে। দ্বিতীয় সপ্তাহে জিন্স। তৃতীয় সপ্তাহ থেকে হাওয়াই শার্ট। টিকটকারদের মতন।
মিটিংয়ে বড় বড় কথা বলে। "স্যার, আমরা যদি একটা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ নিই এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে সিনার্জাইজ করি তাহলে আউটকাম অপটিমাইজ হবে।"
বস মাথা নাড়েন। কেউ কিছু বোঝে না। কিন্তু সবাই মাথা নাড়ে। কারণ না বোঝাটা স্বীকার করলে বোকা মনে হবে।
কাজের কথা বললে বলে, "প্রসেসে আছি স্যার।"
ডেডলাইন মিস করলে বলে, "এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর ছিল।"
বস বিরক্ত হন কিন্তু বলেন না। কারণ তানভীর প্রতিদিন সকালে বসকে দেখলে বলে, "স্যার আপনাকে আজকে অসাধারণ দেখাচ্ছে।"
এই একটা বাক্যের ক্ষমতা ওর তিন মাসের অকাজের চেয়ে বেশি।
---
# # ছয় মাস পর
তানভীর রিজাইন দিলো।
কারণ হিসেবে বললো, "স্যার, অন্য জায়গায় বেটার অপরচুনিটি পেয়েছি। আপনার কাছ থেকে অনেক শিখেছি।"
বস মন খারাপ করলেন। বললেন, "এত ভালো ছেলেটা চলে গেলো!"
আমি চুপ রইলাম।
রফিক এখন অন্য একটা কোম্পানিতে কাজ করে। শুনেছি প্রমোশন পেয়েছে। তার বস নাকি বলেছেন, "এই ছেলে কম কথা বলে, বেশি কাজ করে।"
---
বিকেলে কিচেনে চা বানাচ্ছিলাম।
অফিসের সহকারী করিম ভাই এসে বললো, "ভাই, আবার লোক নেওয়া হবে শুনলাম।"
বললাম, "হ্যাঁ।"
বললো, "এইবার কেমন লোক নেবেন?"
বললাম, "ডায়নামিক, প্রোঅ্যাকটিভ, রেজাল্ট-ওরিয়েন্টেড।"
করিম ভাই মাথা চুলকে বললো, "এইগুলা কী জিনিস ভাই?"
বললাম, "আমিও জানি না।"
দুজনে চুপ করে চা খেলাম।
কর্পোরেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো — এখানে যে সবচেয়ে বেশি বোঝে সে চুপ থাকে, আর যে কিছুই বোঝে না সে সবচেয়ে জোরে কথা বলে।
এবং অফিসে সবসময় জোরে কথা বলা লোকটাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়।
Collected.