13/02/2022
প্রকৌশলী হিসাবে আমাদের যে যে কাজগুলো করতে হয়ঃ
১) #ডিজিটাল_সার্ভে যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তিতে সাইট প্লান আসবে।
২) #সয়েল_টেস্ট যার উপর ভিত্তি করে মাটির ভারবহন ক্ষমতা নির্ণয় হবে এবং সেখানে বিল্ডিং এর পাইলিং লাগবে কি লাগবে না তা নির্ধারণ হবে। পাইলিং লাগলে তার ডিজাইন করতে হবে। ফিল্ডের প্রকৌশলীদের সেই ডিজাইন মোতাবেক পাইল বানিয়ে নিয়ম অনুযায়ী পাইল ড্রাইভ করতে হবে।
৩)প্রত্যাশী সংস্থার চাহিদা মোতাবেক পাশকৃত স্থাপত্য নক্সা অনুযায়ী পুরো বিল্ডিং এর #স্ট্রাকচারাল_ডিজাইন তৈরি করতে হয়। এই স্ট্রাকচারাল ডিজাইন যারা করি তারা শুধুমাত্র কোন ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছরের ডিগ্রিধারী হলে ডিজাইনের ড ও পারবেন না। তাদের হাতে কলমে কোন অভিজ্ঞ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের অধীনে অন্তত ১/২ বছর কাজ করতে হয়। এসময় তিনি বাস্তব বিভিন্ন স্ট্রাকচারাল এনালাইসিস অভিজ্ঞ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের অধীনে ও তার উপার্জিত বিএসসি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বেশ কয়েকটি স্ট্রাকচারাল সফটওয়ারের সাহায্যে একটি পূর্নাংগ স্ট্রাকচারাল নকশা তৈরি করেন। (আমি কোন এক তালা টিনের ঘরের কথা বলছি না, আমি বলছি ২ তলা থেকে শুরু করে ১০/১৫/২০/২৫+ তলা বিল্ডিং এর কথা)। নক্সা তৈরি করার পর সেটা আবার এমোনিয়া শিটে প্রিন্ট করতে হয় যেখানে অনেক অভিজ্ঞ ড্রাফটস্ম্যান কাজ করেন। সেই প্রিন্টেড নকশা আবার রিচেক করে ফিল্ডে পাঠানো হয়। ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়াররা সেটা তাদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বুঝে নেন এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতায় আর্কিটেকচারাল বা স্ট্রাকচারাল নকশার কোন গরমিল/অসংগতি মনে হলে আবার সেটা রিএনালাইসিস করার জন্য উক্ত আর্কিটেক্ট/ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলে শিওর হোন। এখানে বলা দরকার যে, সমস্ত আর্কিটেকচারাল/স্ট্রাকচারাল ডিজাইন কিন্তু ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের দেয়া হয় না বা প্রয়োজন হয় না। ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়াররাও তাদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অনেক ডিসিশন সরাসরি ফিল্ডের সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের প্রোভাইড করেন।
৪) এবার আসুন #এস্টিমেট_রেডি করার কথায়। একটা বিল্ডিং তৈরির সবচেয়ে বড় মুঞ্জিয়ানা হলো তার এস্টিমেট যতো সুন্দর হবে সেই কাজ করতে ততো সুবিধা হবে। অর্থাৎ আমার একটা পূর্নাংগ বিল্ডিং বানাতে কী শুধুমাত্র রড, ইট, সিমেন্ট, বালি, পাথর কতোটুকু লাগবে তাই এনাফ? জী না। একটা বিল্ডিং বানাতে সাইট প্লান অনুযায়ী মাটি ভরাট হতে শুরু করে স্থাপত্য ও স্ট্রাকচারাল নকশা অনুযায়ী বিল্ডিং এর বেসিক সমস্ত উপাদানের পরিমাণ বিল্ডিংটাকে কল্পনায় ছবি একে একেবারে মাটি কাটা থেকে শুরু করে পাইলিং/ফুটিং, গ্রেড বিম, শর্ট কলাম/বিম/কলাম/গাথুনি/প্লাস্টার/স্ল্যাব/রড/ডিপ টিউব-ওয়েল ইত্যাদির এস্টিমেট করতে হয়। এর সাথে সমস্ত স্যানিটারি/ইলেকট্রিক্যাল আইটেম (অন্তত ১৫০+ আইটেম) যুক্ত করতে হয়। এস্টিমেটে আরো থাকে চাহিদা অনুযায়ী নানা রকম অর্নামেন্টাল কাজ যেগুলোর বেশিভাগই করতে হয় এনালাইসিস (বাজার দর যাচায় করে রেট নির্ধারণ)। এভাবে একটা সুন্দর এস্টিমেট রেডি হয় অন্তত ৩০০ আইটেম নিয়ে। কোন একটা আইটেম যদি এস্টিমেটে ছাড়া পরে তাহলে কাজ করতে পরবর্তিতে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। আর এই ৩০০+ আইটেমের স্পেসিফিকেশনও আমাদের মাথায় রেখে কাজ বুঝে নিতে হয়। ফিল্ডে কাজ করার সময় দফায় দফায় টেস্ট করতে হয় রড, ইট, বালি, পাথর, সিমেন্ট, টাইলস, মার্বেল সহ অনেক সিভিল ও ইলেক্ট্রিকাল কম্পোনেন্ট।
৫) এবার আসুন #ফ্যাক্টরি_ভিজিটের কথায়। এই ফ্যাক্টরি ভিজিট মূলত বেশি করতে হয় ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারদের। এ বিষয়ে আমার ডিটেইল জ্ঞান কম। ফ্যাক্টরি ভিজিটের সময় লিফট, জেনারেটর, সাব-স্টেশন ইকুইপমেন্ট ও অন্যন্য অনেক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রিকাল সরঞ্জামাদির সরাসরি ফ্যাক্টরিতে গিয়ে পরিদর্শন করা হয়। এ সময় এসমস্ত জিনিসপত্রের সকল স্পেসিফিকেশন সমন্ধে পূর্ণাংগ ধারণা রাখতে হয়।
৬) ধরুন সমস্ত কাজ প্রায় শেষ। এসময় সবচেয়ে কঠিন ও জটিল কাজ হলো #ভেরিয়েশন_রেডি করা। ভেরিয়েশন রেডি ও চেক করা ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের এক হারকিউনিয়ান টাস্ক। কারন এসময় টেন্ডারের ভেতরের ও বাইরের সমস্ত কাজ নতুন করে পরিমাপ করে নতুন এস্টিমেট রেডি করতে হয়। সাথে যুক্ত করতে হয় সমস্ত রিলেডেট ডকুমেন্টস (অর্থাত কেন বা কোন কাজ কিভাবে বাড়লো কিভাবে কমলো, প্রত্যাশী সংস্থার সকল নতুন চাহিদাপত্রসহ) এই ভেরিয়েশন পাশ করার সময় দুই/তিন স্তরের উর্ধতন ইঞ্জিনিয়ার স্যারের সাথে দফায় দফায় ভাইভা দিতে হয়।
একটা কাজের #মনিটরিং_স্তরসমূহঃ
১) ফিল্ডে বাস্তবায়িতব্য, বাস্তবায়নাধীন ও বাস্তবায়িত সকল কাজ ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের উর্ধতন ইঞ্জিনিয়ার/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যেকোন সময় ভিজিট করা হয়। ফিল্ডে একজন সাব-এসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার সিভিল ও একজন সাব-এসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ইলেকট্রিকাল(গ্রেড ১০), একজন সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার সিভিল ও একজন সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার ইলেক্ট্রিকাল (গ্রেড ৬) এবং একজন নির্বাহী প্রকৌশলী (গ্রেড ৫, যিনি অন্তত ৭/৮-১৫/২০ বছরের অভিজ্ঞ) প্রত্যক্ষ দায়িত্বে থাকেন। তাদের মনিটরিং এর দায়িত্বে থাকেন সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার/এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার/চিফ ইঞ্জিনিয়ার (গ্রেড ৪, গ্রেড ৩/২, গ্রেড ১ যিনারা ১৫ থেকে ৩০+ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন)। উর্ধতন ইঞ্জিনিয়ার সারের ফিল্ড ভিজিটে একটি প্রকল্পের প্রোস এন্ড কোন্স নিয়ে আলোচনা হয়, বিভিন্ন জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যাগুলোর সমাধান খুজে বেড় করা হয়, কাজের মান নিয়ন্ত্রণেও ক্ষেত্রবিশেষে ঠিকাদার বা দায়িত্বরত ইঞ্জিনিয়ারদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। উপযুক্ত জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে উক্ত উর্ধতন ইঞ্জিনিয়ার স্যারেরাও প্রতিনিয়তই সাইট ভিজিটে ব্যস্ত থাকেন।
২) এছাড়াও প্রকল্প পরিচালক (পিডি), ডিপিডি, আইএমইডি টিম, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের ডিএস/জেএস/এডিশনাল সেক্রেটারি/ সেক্রেটারি স্যারেরাও যেকোন সময়ই প্রকল্প ভিজিটে আসেন। তারা ইঞ্জিনিয়ার হোক বা না হোক কাজের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিতে তারাও অত্যন্ত ততপর থাকেন। নন-ইঞ্জিনিয়ারিং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তারাও যথাযথ ভূমিকা পালন করেন ও দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। একটা প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকাও অগ্রগন্য।
এবার আসুন #দায়ভার এর কথায়ঃ
এক কথায় শেষ করি। একটা প্রকল্পের পুরো দায়ভার হলো উক্ত প্রকল্পের সাথে জড়িত ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারগণ। হোক সেটা আজ বা ৫০ বছর পর। যেকোন শাস্তি শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র তাদের প্রাপ্য। শাস্তির বিপরীত কোন জিনিস থাকলে সেটা অন্যরা প্রাপ্য।
ফিল্ডের কাজের #বিভিন্ন_জটিলতাসমূহ খুব অল্প কথায় লিখছিঃ
১) অনেক সময়ই টেন্ডার করতে হয় বাধ্য হতে হয় কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ থাকে প্রকৃয়াধীন যা গণপূর্তের কাজ নয়। ফলে কাজ শুরু করতে হয় বিলম্ব।
২) অনেক সময়ই কাজ শুরুর পর বিভিন্ন কারণে (প্রত্যাশী সংস্থার চাহিদা চেঞ্জ অন্যতম কারণ) স্থাপত্য বা স্ট্রাকচারাল নকশা পরিবর্তন হয়।
৩) অনেক সময় সাইটে গাছ থাকে তা বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে প্রপার সিস্টেমে কাটতে সময় লাগে।
৪) অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক সময়ে ফান্ড থাকে না তাই ঠিকাদার কাজের গতি পায় না।
৫) অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হবার পর বিল্ডিং বুঝে নেয়ার মতো জনবল থাকে না।
৬) অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষের দিকে প্রত্যাশী সংস্থার নতুন চাহিদা অনুযায়ী এস্টিমেটের বাইরের কাজ করতে ঠিকাদারের অনীহা বা ভেরিয়েশন পাশে বিলম্ব হয়।
৭) অনেক সময় বিভিন্ন কারণে সাইটই চেঞ্জ হয়ে যায়।
৮) চাকুরি জীবনে বেশিভাগ ইঞ্জিনিয়ারই সঠিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না। তাই দেশকে আরো উন্নত সেবা দিতে তাদেরও অবশ্যই ঘাটতি থেকেই যায়। বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে সব ইঞ্জিনিয়ারই চায় কাজের গতি থাকুক বা নির্দিষ্ট সময়েই কাজ সফলভাবে শেষ হোক। প্রতিটা বাবা মা যেমন তার সন্তানকে ভালোবাসেন তেমনি একটা ইঞ্জিনিয়ারও তার প্রজেক্টকে ভালোবাসেন এবং চান সুন্দরভাবে কাজ শেষ করতে। এটা মানতেই হবে পৃথিবীর কোন কাজই পারফেক্ট নয়।
আরো অনেক কিছুই লিখতে ইচ্ছে হয় কিন্তু সরকারি কর্মচারি হিসাবে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। আবার অনেক কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমি লিখতেও পারি নি/জানিও না। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে প্রায় ৯ বছরের চাকুরির অভিজ্ঞতার আলোকে (বুয়েট হেকেপ প্রজেক্ট+ বিএডিসি+ পানি উন্নয়ন বোর্ড+ গণপূর্ত) কিছু জিনিস শেয়ার করলাম। কোন ভুল হলে দয়া করে শুধরে দিবেন।
©