04/06/2026
বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। বার্ধক্যের কারণে অনেক সময় তাদের আচরণে শিশুসুলভ জেদ, খিটখিটে মেজাজ বা যৌক্তিকতা হারিয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এই সময়ে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ ধৈর্য, দয়া এবং সেবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সন্তান হিসেবে অনেক সময় তাদের সাময়িক অনিচ্ছা বা জেদের বিরুদ্ধে গিয়েও তাদের প্রকৃত কল্যাণের (যেমন: চিকিৎসা করানো, ওষুধ খাওয়ানো বা ডাক্তার দেখানো) জন্য পদক্ষেপ নিতে হয়। এই বিষয়টি ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং এটি তাদের প্রতি অবাধ্যতা নয়, বরং এক প্রকার 'এহসান' বা উত্তম আচরণ।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো:
# # ১. বার্ধক্যে বাবা-মায়ের আচরণ ও কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মায়ের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। সূরা আল-ইসরা-তে ইরশাদ হয়েছে:
> "তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মায়ের সাথে উত্তম ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়ের ডানা অবনমিত করো এবং বলো— হে আমার পালনকর্তা! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছিলেন।"
> — **সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪**
>
**ব্যাখ্যা:** এই আয়াতে আল্লাহ বাবা-মায়ের বার্ধক্যকালকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। কারণ এই সময়ে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। সন্তান শৈশবে যেমন না বুঝে অবুঝ আচরণ করে, বাবা-মাও বৃদ্ধ বয়সে অনেক সময় তেমন আচরণ করতে পারেন। আল্লাহ সন্তানকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা কোনো অবস্থাতেই বিরক্ত প্রকাশ না করে ('উফ' না বলে) এবং পরম মমতায় তাদের আগলে রাখে।
# # ২. ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কল্যাণের কাজ করা: শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে বাবা-মায়ের আনুগত্য করা ফরজ, তবে তা ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তা আল্লাহর আদেশের বিরোধী হয় অথবা তাদের নিজেদের জন্য ক্ষতিকর হয়। কোনো অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা যদি অবুঝপনা বা রোগের তীব্রতার কারণে ডাক্তার দেখাতে বা ওষুধ খেতে না চান, তবে তাদের সেই 'অনিচ্ছা' মেনে নেওয়া সন্তানের জন্য জরুরি নয়।
* **হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ সন্তানের দায়িত্ব:** ইসলামি ফিকহের নীতি অনুযায়ী, বাবা-মা যখন নিজেদের ভালো-মন্দ বিচার করার শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তখন তাদের জানমাল ও স্বাস্থ্যের হেফাজত করার দায়িত্ব সন্তানের ওপর বর্তায়।
* **ক্ষতি থেকে বাঁচানো অগ্রাধিকার পায়:** সন্তান যদি দেখে যে চিকিৎসা না করালে তার বাবা বা মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে কিংবা কষ্ট বাড়বে, তবে তাদের সাময়িক অসন্তুষ্টির চেয়ে তাদের জীবন রক্ষা ও সুস্থতা নিশ্চিত করা বড় কর্তব্য। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত নীতিমালার আওতাভুক্ত: *"ইসলামে নিজের ক্ষতি করা যাবে না, অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না (লা জারারা ওয়া লা জিরার)"*। তাই তাদের নিজেদের অবুঝ সিদ্ধান্ত থেকে তাদের রক্ষা করা সন্তানের দায়িত্ব।
# # ৩. সেবা ও চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থতায় চিকিৎসা গ্রহণের জোর তাগিদ দিয়েছেন এবং বাবা-মায়ের সেবাকে জিহাদের চেয়েও উত্তম বলেছেন।
* **চিকিৎসা গ্রহণ সুন্নাত:** রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
> "হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ মহান আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি তৈরি করেননি; কেবল একটি রোগ ছাড়া। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেটি কী? তিনি বললেন— বার্ধক্য।"
> — **সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৫৫**
> *(যেহেতু বার্ধক্যজনিত রোগের মূল নিরাময় নেই, তাই এই সময়ে তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সন্তানের দায়িত্ব।)*
>
* **জান্নাত লাভের মাধ্যম:** রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই সন্তানের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যে বাবা-মায়ের বার্ধক্যে তাদের সেবা করে জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না। হাদিসে এসেছে:
> "তার নাক ধুলাধূসরিত হোক, তারপর তার নাক ধুলাধূসরিত হোক, তারপর তার নাক ধুলাধূসরিত হোক। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কার? তিনি বললেন— যে ব্যক্তি তার বাবা-মা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেল, অথচ (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।"
> — **সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫১**
>
# # ৪. এই পরিস্থিতিতে সন্তানের করণীয় (কৌশল ও আচরণ)
যদিও কল্যাণের স্বার্থে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসা করাতে হতে পারে, তবে তা করার পদ্ধতিটি অত্যন্ত মার্জিত ও কৌশলী হওয়া উচিত:
* **জোরজবরদস্তি না করে বুঝিয়ে বলা:** তাদের সাথে শাসকের মতো আচরণ না করে, সন্তান হিসেবে অত্যন্ত বিনয় ও ভালোবাসার সাথে বোঝাতে হবে। যেমন: "তুমি না থাকলে আমাদের কে দেখবে?" বা "তোমার কষ্ট হলে আমাদের খারাপ লাগে"— এই ধরনের আবেগীয় ও সম্মানসূচক কথা ব্যবহার করা।
* **কৌশল অবলম্বন করা:** অনেক সময় সরাসরি ডাক্তারের কাছে যেতে না চাইলে, ঘরোয়াভাবে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে অথবা অন্য কোনো প্রিয় আত্মীয়ের মাধ্যমে তাদের রাজি করানো যেতে পারে।
* **ধৈর্যের চরম পরীক্ষা:** মানসিক বা ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম) জনিত রোগের কারণে তারা যদি সন্তানকে ভুল বোঝেন বা গালমন্দও করেন, তবে তা হাসিমুখে সয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শৈশবে আমাদের মলমূত্র পরিষ্কার করা বা অবুঝ কান্নার সময় তারা এই একই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন।
**উপসংহার:**
অসুস্থ বাবা-মায়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের ডাক্তার দেখানো বা চিকিৎসা করানো কোনো অবাধ্যতা নয়, বরং এটি তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনেরই অংশ। তবে এই কাজটি করার সময় যেন আমাদের ভাষা, আচরণ বা অঙ্গভঙ্গিতে কোনো প্রকার অহংকার বা কর্কশতা প্রকাশ না পায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বাবা-মায়ের বার্ধক্যে তাদের উত্তমভাবে সেবা করার তৌফিক দান করুন। আমীন।