25/12/2025
কিছু কিছু মানুষ আছে যারা আপনাকে আকস্মিক অনেক গভীরভাবে ভালোবাসবে কিন্তু আপনি যখন তাদের সাথে জড়িয়ে যাবেন, তারা আপনার কাছ থেকে সাইকোলজিক্যাল স্পেস তৈরি করবে। তারা আপনাকে আনফ্রেন্ড ও ব্লক করে দূরে সরে যাবে। আপনি যদি এ সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ও অন্য কারও সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তারা পুনরায় ফিরে আসবে আর আপনাকে বলবে, আপনি একজন বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারক।
তারা তখন আপনাকে যুক্তি দেবে, তুমি যদি আমাকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে সম্পর্ক করো, আমিও এখন তোমাকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে সম্পর্ক করব, তোমার সাথে আজকের পর থেকে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এ যেন একটি অন্তহীন লুপ।
আপনি কাছে গেলে তারা নিজের উপর সেলফ কন্ট্রোল হারায়,অন্যদিকে অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা তাদের অসহ্য লাগে। আবার আপনি তাদের ছাড়া বাঁচতে শিখে গেলে তাদের ইগো আঘাতপ্রাপ্ত হয় ও ইর্ষাবোধ করে। এ ধরনের মানুষ আসলে ছোটকাল থেকে বাবা মায়ের অবহেলার শিকার হয়েছিল। এজন্য এরা বড় হয়েও কাউকে সত্যিকার ভালোবাসতে পারে না। এরা ভালোবাসার মানুষকে অবহেলা ও উপেক্ষা করে। এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় "reactive attachment"।
এ মানুষগুলো আপনার সাথে প্রেম করে না, তারা মূলত নিজের ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখে। আপনি যখন তাকে ছেড়ে অন্য কারও কাছে চলে যান, আপনার উপর “Powerless” হয়ে যায়। তার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। কারণ সে অনুভব করে সে প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেছেন, মানুষ যখন সামাজিক প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়, তখন তার মস্তিষ্কের সেই এলাকাগুলো সক্রিয় হয়, যা শারীরীক ব্যথার সাথে জড়িত যেমন এন্টারিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স ও ইনসুলা। আপনি যখন অন্য কারও সাথে সম্পর্ক করেন, তখন আপনার পার্টনার মানসিক আঘাত নয়, শারীরীক আঘাত পায়।
এটা তাদের ইমোশনাল পেইন দেয় না, এটা তাদের নিউরোবায়োলজিক্যাল পেইন দেয়। তাদের দেহে স্ট্রেস হর্মোন বেড়ে যায়, ডোপামিন ও অক্সিটোসিন ক্রাশ করে, বুকে ব্যথা করে, শ্বাসকষ্ট হয়, পেট মোচড় দেয়, অনিদ্রা ও শারীরীক কষ্ট হয়। এই তীব্র শারীরীক যন্ত্রণা থেকে তার এমিগডালা বা ইমোশনাল সেন্টার সক্রিয় হয়, তার ইগো হাইপার অ্যাকটিভ হয়। সে তখন প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে আর প্রতিজ্ঞা করে, তুমি যা করেছ, আমিও তোমাকে ঠিক তাই ফেরত দেব। এটা এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল সেলফ ডিফেন্স, ডমিন্যান্স রিস্টোরেশন।
আর এ সময় তাদের ব্রেন বিকল্প সঙ্গী অনুসন্ধান করে, তারা তাদের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে পুনরায় সক্রিয় করতে চায়, তারা তাদের ডোপামিন ও স্ট্রেস হর্মোন কর্টিসলের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে চায়।
আমরা যখন আফ্রিকার জঙ্গলে ছিলাম, তখন আমাদের কাছে সঙ্গী হারানো ছিল নিরাপত্তা হারানোর মতোই যন্ত্রণাদায়ক। এজন্য কেউ যখন সঙ্গী হারাতো সে দ্রুত গতিতে নতুন সঙ্গী খুঁজে বের করত, আর এটা ছিল তার সার্ভাইভাল রিফ্লেক্স। এজন্য আজকের যুগেও আপনার ভালোবাসার মানুষ আপনাকে ব্লক ও রেস্ট্রিকশন দিয়ে নতুন সঙ্গী অনুসন্ধান করে।
এটা প্রতিশোধের মতো মনে হলেও এটি একটি জেনেটিক ফলব্যাক বিহেভিয়র। সে মূলত নিজেকে নিউরোকেমিক্যালি রিপেয়ার করতে চায়, তার মস্তিষ্কের ক্ষত সারাতে চায়। আমরা যেমন কষ্ট পেয়ে মদ পান করি, তেমনি আমাদের ভালোবাসার মানুষও আমাদের পক্ষ থেকে কষ্ট পেয়ে অন্য কারও সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সে প্রমাণ করতে চায় আমি কখনোই দুর্বল ও পরাজিত নই। সে তার আত্মসম্মান ও ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্য অন্য কোনো মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। এটাকে বলা যায় কম্পেন্সেটরি এটাচমেন্ট অথবা সাইকোলজিক্যাল কাউন্টারব্যালান্স।
তারা ভালোবাসে না — তারা নিজেদের ভেতরের সেলফ ইমেজ ঠিক করতে চায়। তাদের প্রতিশোধ, প্রেম, আকর্ষণ—সবই এককেন্দ্রিক: নিজেকে পুনরুদ্ধার করা, নিজের “ভ্যালু” পুনরায় অনুভব করা। এটাকে “Revenge Love” বলা হয়। তারা ডোপামিন পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন উদ্দীপনা খোঁজে — নতুন সম্পর্ক, নতুন আকর্ষণ, নতুন সেলফ ভ্যালিডেশন।
কিন্তু প্রশ্ন, একটি সম্পর্কে দুজন মানুষই যদি ভিক্টিম হয়, অপরাধ কার? কেন দুইটি “ভাঙা আত্মা”-র রাসায়নিক যুদ্ধ? বিবর্তন তত্ত্ব বলছে, “Revenge Love” আসলে অপরাধ নয়, এটা হলো “Neural survival strategy”। সেলফিশ জিন থিওরি বলছে, আমরা নাকি এক একটি রোবট। আমরা এক একটি সার্ভাইভাল মেশিন! যদি আমরা মেশিনই হই, কেন এত দুর্ভোগ? কোন স্যাডিস্টিক বাস্ট্যার্ড আমাদের জীবনকে এভাবে প্রোগ্রাম করেছে?
কেন দুজন মানুষ ভালোবেসেও দুদিকে ভেসে যাচ্ছে, কেন এই অদৃশ্য অন্ধ যান্ত্রিক গাণিতিক দেয়াল?