17/05/2025
পিএইচডি এর প্রয়োজনীয়তা অথবা অপ্রয়োজনীয়তা:
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিএসসি এবং এমএসসি তে ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের মাঝে পিএইচডি করার প্রতি প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। পিএইচডি তে ভর্তির জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয়, কোথায় স্কলারশিপ পাওয়া যায়, বা কোন পরীক্ষাগুলো লাগবে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, “কেন পিএইচডি করবো?” - এই মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর তাদের অনেকের কাছেই অস্পষ্ট।
পিএইচডি অনেক সময় একটি সামাজিক ও মানসিক ফাঁদে পরিণত হয়। বিএসসি এবং এমএসসি তে ভালো সিজিপিএ মানেই যেন পরবর্তী ধাপ পিএইচডি—এমন এক অদৃশ্য ছক তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পথটি কি সত্যিই সবার জন্য?
বেশির ভাগ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য উন্নত দেশে পিএইচডি করতে আসে শুধুমাত্র একটি "সারভাইভাল প্ল্যান" নিয়ে—একটা ভালো ডিগ্রি, তারপর পোস্টডক, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু এই লাইন ধরে ক্যারিয়ার গড়তে গেলে দেখা যায়, পিএইচডি শেষে মাস্টার্স লেভেলের চাকরি করেই থেমে যেতে হয়।
আর প্ল্যান যদি তাই হয় তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—পিএইচডি কি ওভাররেটেড?
যদিও বাইরে থেকে মনে হতে পারে পিএইচডি বা পোস্টডক পাওয়া খুবই কঠিন, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—আসল লড়াই শুরু হয় পিএইচডি বা পোস্টডক সম্পন্ন করার পর। সেই তুলনায় পিএইচডি বা পোস্টডক করা বরং তুলনামূলক সহজ কাজ।
আরও হতাশাজনক বিষয় হলো, অনেকেই এত বছর পরিশ্রম করে পিএইচডি ও পোস্টডক শেষ করেও শেষ পর্যন্ত একটি মাস্টার্স লেভেলের চাকরিতে থেমে যান। এমন পরিণতি নিঃসন্দেহে একজন গবেষকের জন্য হতাশাজনক এবং ক্যারিয়ারের দিক থেকে অনেকটাই বেদনাদায়ক।
পিএইচডি এর মূল লক্ষ্য মূলত প্রফেসর বা মৌলিক গবেষক হওয়া। সমসাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী Biological Sciences-এ, পিএইচডি করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩.৫% academia-তে টিকে থাকতে পারে, আর মাত্র ০.৫% প্রফেসর পদে স্থায়ী হতে পারে। প্রতি ২০০ জনে মাত্র ১ জন! প্রতি বছর নতুন নতুন পিএইচডি ডিগ্রীধারীর সংখ্যা বাড়ছে, অথচ একাডেমিক পজিশনের সংখ্যা বাড়ছে না—ফলে সময়ের সাথে সাথে এই অনুপাতের আরও অবনতি ঘটবে।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর গবেষণা ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের চাহিদা খুবই সীমিত। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিভাগ থাকলেও, সেখানে পিএইচডি লেভেলের পদসংখ্যা খুবই কম।
অনেকে ভাবতে পারেন—"তাহলে এত পিএইচডি ডিগ্রিধারী তো বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি করছে!" কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা হলো, এই ডিগ্রিধারীরা অনেক সময় বিএসসি বা এমএসসি পর্যায়ের চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন, কারণ তারা সহজলভ্য। একটি প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যখন কম বেতনে বা একই বেতনে একজন উচ্চ যোগ্যতার প্রার্থী পাওয়া যায়, তখন তাকে না নেওয়ার কোনো কারণ থাকে না।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারীর জন্য এমন একটি চাকরি আদৌ উপযুক্ত কি না? সেই কাজ কি তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন করে? নাকি এটি শুধুই ক্যারিয়ারের একরকম বাধ্যতামূলক সমঝোতা?
পিএইচডি বা পোস্টডক শেষ করার পর অধিকাংশ অভিবাসী শিক্ষার্থী একাডেমিয়ায় টিকতে পারেন না। এই “পরাজয়” নিছক ভাগ্য নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে কিছু গভীর ও কাঠামোগত কারণ। মূল কারণগুলো অনেকটা নিন্মরূপ:
১) আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি এর সুযোগ পেলেই চলে আসে। এখানে পিএইচডি থেকেও বড় লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিংহভাগ ফান্ডগুলো যায় এখানকার গুটিকয়েক নামী দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই অন্যান্য বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা নিজেরাই ফান্ড সংকটে ভোগে। আর যেহেতু একজন গবেষকের ভবিষ্যৎ অনেকটাই তার গবেষণা মেন্টরের উপর নির্ভরশীল, তাই এমন পরিবেশে পিএইচডি শুরু করাটা একাডেমিক ক্যারিয়ারের শুরুতেই পিছিয়ে পড়ার শামিল।
২) দেশ থেকে আসার পর অনেক শিক্ষার্থী প্রথমেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী হওয়া নিয়ে। এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়, কিন্তু একে যদি প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে নেয়া হয়, তবে একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়ার মতো একটি সময়নির্ভর প্রক্রিয়ায় সে পিছিয়ে পড়ে। এরই মধ্যে যারা গবেষণায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে, তারা অনেকটাই এগিয়ে যায়।
৩) আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী এমএসসি শেষ করার পরপরই বিয়ে, সংসার এবং সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করে ফেলেন। এতে করে গবেষণার সাথে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রাখা হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন। এর পেছনে পারিবারিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা ও সংস্কৃতির একটি ভূমিকা থাকেই। কিন্তু যারা একাডেমিয়াতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ারে পারিবারিক জীবন অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই বিষয়টি হয়তো আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ বা সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কিন্তু একাডেমিক জগতে প্রতিযোগিতা ও সময়ের চাপ এতটাই বেশি যে, এমন বাস্তবতা মেনে নিতে হয়।
একজন পিএইচডি এর ছাত্র ল্যাব এ কাজ শুরু করার ১/২ বছরের মাথায় বুঝে যাবে তার ফিউচার, কারণ পরবর্তী বিষয়গুলো অনেকটাই কানেক্টেড।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ফান্ড এর অবস্থা দিন দিন কমে আসছে। এটি পরোক্ষভাবে পিএইচডি কে নিরুৎসাহিত করা। শুধুমাত্র যারা অত্যন্ত প্রতিভাবান, আবিষ্কারের নেশায় মত্ত, শুধুমাত্র সেই গুটিকয়েক ছাত্রছাত্রীকেই পিএইচডি করতে উৎসাহিত করা হয়। আর এটাই হওয়া উচিৎ।
Academia-তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত কঠিন। পিএইচডি থেকে academic পসিশন সিকিউর করার সময়টুকু খুবই সামান্য। এই অল্প সময়ের মাঝে outstanding novel research, high quality multiple publication, collaboration set up, mentoring, conference talk, travel, scientific training, preliminary data, grant writing সব গুলো ম্যানেজ করতে হবে। এই criteria গুলোর একটা কমলেও হবে না বরং বেশি থাকলে ভালো।
সুতরাং, যারা পিএইচডি করে একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের প্রথমে নিজেদের ভালো করে জানানো জরুরি। নিজের সামর্থ্য কতটুকু, গবেষণা কতটা ভালো লাগে, কতটা ধৈর্য আছে, কতটা stress নিতে পারবে, ফ্যামিলি লাইফ কতটা স্যাক্রিফাইস করতে পারবে? এগুলো বিবেচনা করে যদি পজিটিভ ফীল হয় তাহলে একটি উপযুক্ত পরিকল্পনা নিয়েই পিএইচডি করতে আসা উচিৎ।
মনে রাখতে হবে, পিএইচডি করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে academic carrier করতে চায় তারা প্রত্যেকে রেসের ঘোড়া, আরবীয় তাজা ঘোড়া।
© Shamsul Alam