10/01/2026
শূন্য কি নীরব?
আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় আকাশ নিস্তব্ধ এবং শান্ত। নক্ষত্রের ঝিকিমিকি আলোর মাঝেও যেন একটি গভীর নীরবতা বিরাজ করে। বহুদিন ধরে মানুষ শূন্যকে শুধু ফাঁকা স্থান বা নিঃশব্দ স্থান হিসেবে ভাবেছে। শূন্যকে নীরব মনে হয়, কারণ সেখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো পদার্থ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে শূন্য আসলে নীরব নয়।
বিশালতা নামের একটি গবেষণা প্রকল্পে বিজ্ঞানীরা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের মহাকাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সেই তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শূন্যেও রয়েছে এক ধরনের ছন্দ এবং কম্পন। এই ছন্দ বা সুরকে বিজ্ঞানীরা ‘সিন্থেটিক হারমোনিক্স’ বা কৃত্রিম সুর বলছেন। সহজভাবে বলতে গেলে, শূন্যও একটি ধরণের সঙ্গীত বহন করছে, যা আমরা কানে শুনতে পাই না, কিন্তু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে তা ধরা যায়।
শূন্যকে ফাঁকা মনে হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সেখানে পদার্থ নেই। তবে পদার্থের অনুপস্থিতি মানে সেখানে কোনো ক্রিয়া নেই, এমনটা নয়। শূন্যে সূক্ষ্ম কম্পন ও তরঙ্গ থাকে। এই কম্পন হয়তো প্রাথমিক মহাবিশ্বের বিস্ফোরণ থেকে এসেছে, হয়তো নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু বা গ্যালাক্সির নড়াচড়া থেকে। অর্থাৎ শূন্য একেবারেই নিঃশব্দ নয়, বরং তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের বহু ঘটনা এবং ইতিহাস।
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, কারণ আমাদের দেশেও এখন মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহ বাড়ছে। দেশের বিজ্ঞানীরা চাঁদ ও গ্রহ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণায় অংশ নিচ্ছেন। তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় মহাকাশের এসব রহস্য বোঝার চেষ্টা করছেন। এই গবেষণার মাধ্যমে মানবজাতি মহাবিশ্বের আরও অনেক নতুন দিক অন্বেষণ করতে পারবে।
শূন্যকে শুধু ফাঁকা ভাবা ভুল হবে। শূন্য একটি নীরবতার আড়ালে একটি অদৃশ্য সুর বহন করছে। এটি আমাদের শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। মহাবিশ্বের গোপন সুর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে নীরবভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যেমন একটি প্রবাদ আছে, “নীরবতাতেও কথা বলা সম্ভব”, ঠিক তেমনি শূন্যও নিঃশব্দ নয়, বরং তার নিজস্ব ছন্দ আছে।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের সেই সুরকে শোনা সম্ভব করছে। অত্যাধুনিক রেডিও টেলিস্কোপ এবং মহাকাশযন্ত্র ব্যবহার করে গবেষকরা শূন্যের কম্পন ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এই কম্পনগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে শূন্যও বিভিন্ন ধরনের তরঙ্গ ও ছন্দের সংমিশ্রণ। এটি এমনভাবে সাজানো যে, মনে হয় শূন্যও একটি অদৃশ্য সংগীত পরিবেশন করছে।
আমরা যদি শূন্যকে নিঃশব্দ মনে করি, তাহলে আমরা মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য সঙ্গীত শুনতে পারি না। বিজ্ঞান আমাদের শেখাচ্ছে যে মহাকাশের ফাঁকফোকরও শূন্য নয়, বরং তা ক্রমাগত কিছু না কিছু বার্তা প্রেরণ করছে। প্রাচীন কাল থেকে মানুষ আকাশকে রহস্যময় মনে করেছে। এবার বিজ্ঞান সেই রহস্যকে আরও কাছে এনে দিয়েছে।
শূন্যের রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে গবেষণা ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে আমরা তা ক্রমশ বুঝতে পারছি। শূন্য শুধু ফাঁকা নয়। শূন্যও কথা বলছে, শূন্যও ছন্দ করছে, শূন্যও আমাদেরকে আকাশের আরও গভীর সত্য জানাচ্ছে। এই উপলব্ধি আমাদের মহাবিশ্বের প্রতি ভ্রান্ত ধারণাকে বদলাচ্ছে। শূন্য আর নিঃশব্দ নয়। এখন আমরা শূন্যকে শুনতে শুরু করেছি।
✍🏻 Chinmoy Paul