08/02/2026
শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কৃত্রিম বিভাজন রাষ্ট্র, নীতি ও বাস্তবতার প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দুইটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য সুস্পষ্টভাবে একটি অশনিসংকেত।
“বৈষম্য বা কোটা” এবং “নিয়োগ বিধিমালা”—এই দুটি ভিন্ন বিষয়কে একাকার করে বিএসসি ও ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রাষ্ট্র তার প্রয়োজন ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী পৃথক পৃথক নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। সেই নীতিমালার আলোকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য ১০ম গ্রেডের ২য় শ্রেণীর পদ নির্ধারিত রয়েছে এবং বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ৯ম গ্রেডসহ বিসিএসের মাধ্যমে ১ম শ্রেণীর পদ সংরক্ষিত রয়েছে। এটি কোনো পক্ষের প্রতি বৈষম্য নয়; বরং একটি স্তরভিত্তিক (layered) প্রশাসনিক কাঠামোর স্বাভাবিক বাস্তবায়ন।
১০ম গ্রেড থেকে প্রমোশনের মাধ্যমে ৩৩% কর্মকর্তা ৯ম গ্রেডে উত্তীর্ণ হওয়া যেমন বৈষম্য নয়, তেমনি ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ বা ৫ম গ্রেডে শতভাগ প্রমোশন পাওয়াও বৈষম্য নয়। প্রমোশন ব্যবস্থা না থাকলে চাকরির কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিতর্কের কেন্দ্রে যে প্রশ্নগুলো
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের ২য় শ্রেণীর পদে আবেদন করতে না পারা কি প্রকৃতপক্ষে বৈষম্য, নাকি শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ বিধিমালার বাস্তবায়ন?
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ৯ম গ্রেডে আবেদন করতে না পারা কি বৈষম্য, নাকি শিক্ষার ক্যাটেগরি অনুযায়ী পদের শ্রেণিবিন্যাস?
ডিগ্রি পাস শিক্ষার্থীরা অনার্স শিক্ষার্থীদের মতো বিসিএসে আবেদন করতে না পারলে সেটি কি বৈষম্য, নাকি নীতিমালা?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি একই যুক্তিতে সমান সুযোগ দাবি করে আন্দোলনে নামে, সেটি কি নীতিগতভাবে যৌক্তিক হবে?
এই প্রশ্নগুলো আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়—সব সীমাবদ্ধতাই বৈষম্য নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো কাঠামোগত নীতির অংশ।
আসল সংকট কোথায়?
প্রকৃত সংকট কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগোষ্ঠীর মধ্যে নয়, সংকট হলো—
পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব: দেশে প্রায় ২৭ লাখ শিক্ষিত বেকার, অথচ সরকারি শূন্যপদ মাত্র প্রায় ৫ লাখ।
মোট কর্মক্ষম গ্র্যাজুয়েট প্রায় ৫৫ লাখ হলেও সরকারি চাকরির সংখ্যা মাত্র ২২ লাখ—অর্থাৎ মাত্র ৩.১% মানুষের সরকারি চাকরির সুযোগ।
লাগামহীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিগ্রি ইনফ্লেশন ও শিক্ষার মানের অবনমন।
কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা (TVET)-এ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও গুরুত্বের অভাব।
উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সামাজিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা।
সমাধানের পথ
চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বের হয়ে উদ্যোক্তাকে সামাজিকভাবে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে আসা।
গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষ উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও ইনকিউবেশন হাব গড়ে তোলা।
অপ্রয়োজনীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ বন্ধ করে শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও ডিগ্রি ইনফ্লেশন নিয়ন্ত্রণ।
শিক্ষা বাজেটের অন্তত ২০–৩০% কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি (চীন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে)।
শিক্ষার ক্যাটেগরি অনুযায়ী সরকারি খাতে, বিশেষ করে ৯ম গ্রেডে, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ এখনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সময় পার করছে। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই উন্নয়নের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
এই তরুণ শক্তিকে বিভাজন, মিছিল ও স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশ এগোবে না।
অতএব, সময় থাকতে মূল সংকট চিহ্নিত করতে হবে, গোঁড়া থেকে সংস্কারের দাবি তুলতে হবে এবং নিজেদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত বন্ধ করতে হবে।
দেশের জন্য বিএসসি, ডিপ্লোমা, ডিগ্রি—সবাই প্রয়োজন। কাউকে দুর্বল করে নয়, সবাইকে শক্তিশালী করেই এগোতে হবে।