Suzerain Incorporation

Suzerain Incorporation The Leading Organization of Technology. Contact Via Whatsapp - +8801893441537

01/11/2021

We are gonna start our journey very soon

03/07/2020

Verified By IT Experts

02/07/2020

Look behind for better world.

20/06/2020
12/04/2020

অ্যাভিগান বিষয়ক ক্ষুদ্র জ্ঞান....

অ্যাভিগান নামের ঔষধ নিয়ে প্রচুর কথা চলছে। এর জেনেরিক নাম ফ্যাভিপিরাভির। এটার মূল পেটেন্ট ফুজিফিল্মের কাছে। তাদের একটা ঔষধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে যেটার নাম ফুজি টোয়ামা । তারা মূলত রেডিওফার্মাসিউটিকাল/ তেজস্ক্রীয় ঔষধ, ক্যানসার, স্নায়ুতন্ত্র ও সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে গবেষণা করে।

এরা ২০১২-১৩ সালে ফ্যাভিপিরাভির তৈরী করে, যা পশুর শরীরে পরীক্ষায় বেশ কিছু ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে বলে প্রমান পাওয়া যায়। যেমন ফ্লু, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, রিফট ভ্যালি ফিভার ভাইরাস ও ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ ইত্যাদি।

২০১৩ সালেই আমেরিকার এফ ডি এ, এটার ফেজ থ্রি ক্লিনিকাল ট্রায়াল করেছিল। সেখানে এটা ফ্লুর বিরুদ্ধে কাজ করে বলে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু ঔষধটি বাজারজাত করা হয় নাই। এর কারন কি?

কারন হলো গবেষণায় এটা টেরাটোজেনিক বলে প্রমাণিত হয়। মানে এটা গর্ভস্থ ভ্রুন ও শিশুর মারাত্মক ক্ষতি করে। এর ফলে গর্ভের শিশুর মৃত্যু হতে পারে , বিকলাংগ শিশু জন্ম নিতে পারে। এর অন্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও আছে।

গবেষণাটি র‌্যান্ডমাইজড ডাবল ব্লাইন্ডেড প্লাসেবো কন্ট্রোল স্টাডি ছিল। সেখানে একদলকে প্লাসেবো দেয়া হয়েছিল। আরেক দলকে ঔষধ। গবেষণাটি দৈবচয়ণ করে অংশ গ্রহণকারী বেছে নিয়েছিল। গবেষকরা ডাবল ব্লাইন্ড ছিলেন। অর্থাৎ যারা ঔষধ খাচ্ছেন তারা জানতেন না তারা কি প্লাসেবো নিচ্ছেন নাকি ঔষধ, আর গবেষকরাও জানতেন না কাকে ঔষধ দিচ্ছেন আর কাকে প্লাসেবো। যারা গবেষণা করেন, তারা এটা বুঝবেন। এটা ঔষধ পরীক্ষার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

তবে টেস্টিং এর এক্সক্লুশন ক্রাইটেরিয়া ছিল বিরাট।
১.গর্ভবতী মা, স্তন্যদায়ী মা,
২.৪ সপ্তাহের মধ্যে ফ্লু টিকা নিয়েছেন এমন ব্যক্তি,
৩, অ্যাজমা বা ক্রনিক ফুসফুসের অসুখ আছে এমন ব্যক্তি,
৪. গাউট আছে যাদের,
৫,যাদের ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া আছে,
৬.যাদের অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ও প্যারাসিটামলে অ্যালার্জি আছে,
৭. যারা স্টেরয়েড নেন,
৮. যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এমন অসুখ আছে,
৯. গবেষণার আগের ১ বছরের মধ্যে যাদের মানসিক অসুস্থতা বা মানসিক রোগের ঔষধ খাওয়ার ইতিহাস আছে.
১০.যাদের কিডনি জটিলতায় ডায়ালিসিস করতে হয়,

এমন মানুষদের এই গবেষণায় রাখা হয় নাই।

তার মানে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ এর বাইরে ছিলেন।
২০১৫ সালে এই স্টাডি শেষ হয়। ২০১৪ সালে জাপানে এটা তৈরী করার অনুমোদন দেয়া হলেও স্বাভাবিক সময়ে এটা বাজারে পাওয়া যায় না। এটা কেবল হাসপাতালে দেয়া হয় এবং এটা তৈরী ও ব্যবহারের আগে জাপানের স্বাস্থ্য, কল্যান ও শ্রম মন্ত্রনালয়ের অনুমতি নিতে হয়। এবারো জাপানে এটা তৈরীর অনুমতি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নিতে হয়েছে। কেবল মাত্র কোন ভাইরাল
আউটব্রেক হলে এটা তারা ব্যবহার করবে বলে রেখে দিয়েছিল।

কোভিড ১৯ শুরু হওয়ার পরে চীনে এটা ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে চীনের ন্যাশসাল রিসার্চ সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ এর গবেষক কিংজিয়ানলাই যিনি থার্ড পিপলস হসপিটাল শেনজেন এ কাজ করেন, তিনি বলেছেন যে এই গবেষণায় তারা দেখেছেন যে এটা টেস্টে পজিটিভ হবার ৪ দিনের মধ্যে, রোগের লক্ষন প্রকাশের আগেই দিলে বেশী কাজ করে। এটা কাজ বেশী করে কমবয়সী, সঠিক ওজনের মানুষের মধ্যে. যাদের তখনো জ্বর হয় নাই ।

তাদের পরীক্ষাটি ছিল ননর‌্যান্ডম এবং ননব্লাইন্ড।

তাহলে ১৮ মার্চ ২০২০ এ গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত হলো , চীন দাবী করেছে অ্যাভিগান কাজ করছে। এত দুর্বল গবেষণায় আসলে এটা বলা সম্ভব না।

গবেষক নিজেই যেখানে বলেছেন যে এটা মূলত: যাদের টেস্ট পজিটিভ কিন্তু রোগ এর লক্ষন প্রকাশিত হয় নাই তাদের বেলায় বেশী কাজ করে।

তার মানে টেস্ট যে দেশে বেশী করা হবে সেখানে এটা বেশী কাজ করবে কারন রোগের লক্ষন প্রকাশের আগেই এটা দিলে বেশী কাজ করে।

২০১৪ সালেও লাইবেরিয়াতে ইবোলাতে আক্রান্ত এক নার্সের শরীরে এটা কাজ করেছিল বলে রিপোর্ট হয়েছিল। গিনিতেও এটা দেয়া হয়েছিল । কিন্তু সেসবই ইবোলা কেসে। কোভিড এর বেলায় এটার পরীক্ষা এখনো সন্তোষজনক না।

অ্যাভিগান কিভাবে কাজ করে?

এটা আর এন এ ভাইরাসের আর এন এ পলিমারেজ নামের এনজাইমকে বাধা দেয়। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তখন আমাদের শরীর ভাইরাল লোড কম থাকায় সহজে এটাকে মারতে পারে।

এর কর্মপদ্ধতি থেকেই কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে যার শরীরে অনেক ভাইরাস বংশবৃদ্ধি করেছে ও নিউমোনিয়া করে ফেলেছে, তাদের বেলায় এটা বেশী কাজ করবে না।

তার মানে হলো যে দেশে প্রচুর টেস্ট হচ্ছে এবং আক্রান্তদের রোগের লক্ষন প্রকাশের আগেই সনাক্ত করা যাচ্ছে তাদের বেলায় এটা দেয়া সহজ। টেস্ট ছাড়া এমনি এমনি এটা খাওয়া যাবে না। এটা হাসপাতাল ছাড়া জাপানেও কাউকে দেয়া হয় না।

নতুনভাবে ফেজ থ্রি ট্রায়াল আবার শুরু করেছে জাপান। আমেরিকাও এটা করবে।

এবার বুঝে নেন ফেজ গুলি কি?
ফেজ ওয়ানে ঔষধের ডোজ, সেফটি ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সনাক্ত করা হয়,

ফেজ টু তে আরো গভীর ভাবে ঔষধ কাজ করে কিনা সেটা দেখা হয় ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা হয়,

ফেজ থ্রি তে দেখা হয় যেসব ঔষধ এরি মধ্যে আছে সেটার চেয়ে এটা ভালো কিনা বা সমান কিনা

আর ফেজ ফোরে দেখা হয় আর কি রয়ে গেছে যা জানা হয় নাই।

যেসব ঔষধ ট্রায়ালে যায় ফেজ ওয়ানে তার মধ্যে মাত্র ১৪% ঔষধ সবগুলি ফেজ পার হয়ে বাজারে আসতে পারে।

তার মানে বুঝেছেন তো, দুই চারটা রোগী আর দুয়েকদিনের বিষয় না। এটা বেশ সময়. শ্রম ও অর্থের বিষয়। ফেজ থ্রি থেকে প্রতি ৫ টা ঔষধের ২ টা বাদ পড়ে যায়।

অ্যাভিগানের বিষয়টা অন্য রকম। এটা একবার ফেজ থ্রি শেষ করেছে সাধারন ফ্লুতে এর কাজের পরীক্ষা দিয়ে। সাধারনত ১ থেকে ৪ বছর লাগে একটা ঔষধের ফেজ থ্রি ট্রায়াল শেষ করতে। ধরে নিলাম এটা এবার সবচেয়ে তাড়াতাড়ি হবে। তাহলেও এটার ফেজ থ্রি ট্রায়াল শেষ করতে ৬ মাস তো লাগবেই।

অথচ ২৯ টা গবেষণা পত্র নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে কোয়ারেন্টিন,
টেস্ট ,
সামাজিক দূরত্ব ও সাবান, এই ভাইরাসকে ঠেকাতে পারে।

তারপরেও আমরা বসে থাকি ঔষধ খাবোই খাবো এমন একটা পণ করে।

সেই পৃথিবীর কথা কল্পনা করেন যেখানে কোন অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টি ভাইরাল ছিল না। মানুষ কিন্তু টিকে গেছে। কিভাবে?

তখন মানুষে মানুষে এত যোগাযোগ ছিল না। ২৪ ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা যাওয়া যেতো না। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মানুষ চিনতো না। ফলে ওই মহাদেশ দুটি এমনিতেই কোয়ারেন্টিন ছিল।

আমাদের সভ্যতা আমাদের এত কাছে এনেছে যে উহান থেকে নিউইয়র্ক যেতে আর ১৪ দিন লাগে না।

আগে জাহাজে যেতে হতো । চিন্তা করেন জাহাজে গেলে ১৪ দিন হয়ে যেতো জাহাজের ভেতরেই। অসুখ বিসুখ হয়ে যারা মরার মরে যেতো। নিউইয়র্ক এ রোগ ঢুকতো না। উড়োজাহাজ সব বিগড়ে দিয়েছে।

প্রকৃতি আমাদের সংক্রমনের সময় যা করতে বলেছে সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ। অ্যাভিগান নিয়ে হাহুতাশ না করে, মরিচিকার পেছনে না দৌড়ে প্রমাণিত কাজটি করুন।

অ্যাভিগান আমাদের দেশে এমনিতেও ভালোভাবে ব্যবহার করা যাবে না, কারন আমাদের দেশে টেস্টের সুবিধা সীমিত।

লক্ষনওয়ালাদেরই অনেকের টেষ্ট হয় না, আর রোগীর সংস্পর্শে আসাদের টেস্টতো বহু পরের বিষয়।

এবার কিছু ভালো খবর দেই।

চাইনিজরা টাকা ঢালছে টিকা বানাতে।

জাপানীরা টাকা ঢালছে পলিক্লোনাল ইমিনোগ্লোবুলিন বা অ্যান্টিবডি সিরাম তৈরীর পেছনে।

জাপানীরা অ্যভিগানকেও ট্রায়াল দিচ্ছে।
জাপানীরা জিন থেরাপী করারও চেষ্টা করছে যার মাধ্যমে ভাইরাল স্ট্রেসনটিকে একটা ডিকয় রিসেপ্টর দিয়ে নিষ্ক্রিয় করা যায়।

জিএসকে ও ইনোভ্যাক্সও টিকা তৈরীর চেষ্টা করছে।

তার মানে একটা কিছু হয়ে যাবে। ততো দিন আমাদের টিকে থাকতে হবে। টিকে থাকার উপায় হলো সংক্রমনটিকে দেরী করানো।

যতো দেরী ততই ঔষধ/ টিকা পাবার সম্ভাবনা।
তাই অ্যাভিগান বাদ দিয়ে জ্ঞান সঞ্চয় করেন। যা কিছু দেখেন সেটাই শেয়ার না দিয়ে পড়াশোনা করেন। ভালো ছাত্র কে হয় জানেন?
যে ভালো শিক্ষকের কাছে যায়।
Credit Dr Abdur Noor Tusher

10/04/2020

টমাস আলভা এডিসন এর জীবনী: একজন আলোর কারিগর
অনুপ্রেরণাজীবনী

By Tamzid Rahman
টমাস আলভা এডিসন এর মত সমৃদ্ধ জীবনী খুব কম মানুষেরই আছে। তাঁর মত সফল মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসেই খুব কম এসেছেন। আধুনিক বৈদ্যুতিক বাতি, সাউন্ড রেকর্ডিং, ভিডিওগ্রাফির মত আবিষ্কার সহ মোট ১০৯৩টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে তাঁর নামে। এত বড় একজন বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক হওয়ার পাশাপাশি টমাস আলভা এডিসন ছিলেন ইতিহাসের সেরা একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের আজকের মূল্য ১৭১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি! আজকের ইলন মাস্ক বা স্টিভ জবস এর মত টেক জিনিয়াসরা তাঁকে একবাক্যে গুরু মানেন। ইলন মাস্ক তো বেশ কয়েকবারই বলেছেন যে তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণাই হলেন ‘আমেরিকা’স গ্রেটেস্ট ইনভেন্টর’ টমাস এডিসন। বর্তমান যুগের প্রযুক্তির শুরু মূলত তাঁর হাত দিয়েই।

যে লোকটি বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কার করতে গিয়ে ১০ হাজার বার ব্যর্থ হয়েও থেমে না গিয়ে চেষ্টা করে গেছেন, এবং একবারের বেশি পৃথিবীর ইতিহাসকেও বদলে দিয়েছেন – তাঁর কাছ থেকে অবশ্যই অনুপ্রেরণা নেয়া যায়।

আর টমাস আলভা এডিসনের জীবনী থেকে যেন আপনিও অনুপ্রাণিত হতে পারেন, তাই আমরা আজ আপনার সামনে তুলে ধরছি বাংলা ভাষায় মহান বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন এর জীবন কাহিনী।

টমাস আলভা এডিসনের জীবনী:
এক নজরে টমাস আলভা এডিসন এর জীবন কাহিনী:
১৮৪৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া টমাস আলভা এডিসন একজন বিশ্ব বিখ্যাত আমেরিকান বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক ও সফল উদ্যোক্তা। খুবই সাধারণ অবস্থা থেকে প্রতিভা আর পরিশ্রমের জোরে তিনি সমাজের সবচেয়ে ওপরের সারির একজন হিসেবে নিজের জায়গা করে নেন, এবং ইতিহাস বদলানো একাধিক আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীর চেহারা পাল্টে দেন। পৃথিবীর প্রথম ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ল্যাবরেটরি “উইজার্ড অব মিলানো পার্ক” তাঁর হাতে গড়া।

আধুনিক আমেরিকার উন্নত অর্থনীতি আর প্রযুক্তির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা লোকদের অন্যতম একজন তিনি। সেইসাথে, ইতিহাসের সেরা একজন আবিষ্কারক হিসেবে তিনি সারা বিশ্বে সম্মানিত।

১৯৩১ সালের ১৮ই অক্টোবর এই অসাধারণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ও সফল উদ্যোক্তার মৃত্যু হয়।

টমাস আলভা এডিসন এর প্রধান প্রধান আবিষ্কার:
টমাস আলভা এডিসনের মোট ১০৯৩টি আবিষ্কারের পেটেন্ট ছিলো। এগুলোর মধ্যে , বৈদ্যুতিক বাল্ব, আধুনিক ব্যাটারি, কিনটোগ্রাফ ক্যামেরা (প্রথম যুগের ভিডিও ক্যামেরা), সাউন্ড রেকর্ডিং – ইত্যাদি ছিলো তাঁর সেরা ও সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার। এসবের বাইরেও তিনি ছোট-বড় অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন। ১০৯৩টি সফল আবিষ্কারের পাশাপাশি ৫০০ থেকে ৬০০টি অসফল আবিষ্কারও তিনি করেছেন। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি সেগুলোও সফল করতেন।

ছেলেবেলা:
টমাস এডিসন ১৮৪৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের মিলানে জন্মগ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক কারণে কানাডা থেকে বিতাড়িত স্যামুয়েল এডিসন, এবং স্কুল শিক্ষিকা ন্যান্সি এডিসনের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে টমাস ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় টমাসের ওপর তাঁর মায়ের দারুন প্রভাব ছিল।

একদম ছোটবেলায় লালজ্বরে আক্রান্ত হয়ে টমাসের দুই কানে ইনফেকশন হয় এবং বড় হয়েও তিনি কানে প্রায় শুনতেনই না।
১৮৫৪ সালে এডিসন পরিবার মিশিগানের পোর্ট হার্টনে চলে যায়, এবং সেখানে টমাসকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। টমাস আলভা এডিসনের স্কুল জীবন ছিল মাত্র ১২ সপ্তাহ বা তিন মাসের মত। তিনি এতই দুষ্টু আর পড়াশোনায় অমনোযোগী ছিলেন যে, তাঁর স্কুল থেকে প্রতিদিন অভিযোগ আসতে শুরু করল। মা ন্যান্সি এডিসন এক পর্যায়ে তাঁকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে বাসায় পড়াতে শুরু করেন।

এডিসনের বয়স যখন ১১ বছর, তখন তাঁর মা লক্ষ্য করলেন, ছেলে নিজের ইচ্ছায়ই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহের সাথে পড়াশুনা করছে। ন্যান্সি টমাসকে তাঁর নিজের যা পড়তে ভালো লাগে – তা-ই পড়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এবং দেখা গেল, এতে করে টমাসের পড়ার প্রতি দারুন একটি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ইচ্ছামত জ্ঞান অর্জন করার এই স্বভাবই পরে ‘লিটল্ টমাস’ কে টমাস আলভা এডিসন, দি গ্রেট ইনভেনটর হতে সাহায্য করেছে।

১২ বছর বয়সে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রেললাইনে পত্রিকা বিক্রী করতে দেয়ার জন্য বাবা-মা’কে রাজি করিয়ে ফেলেন টমাস। খবরের কাগজের ছাপাখানায় নিয়মিত যাতায়াত করার সুযোগে টমাস অল্প দিনের মধ্যেই নিজের একটি ছোট নিউজপেপার প্রকাশ করে ফেলেন, যার নাম ছিল, “দি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক হেরাল্ড”। সাম্প্রতিক মজার ঘটনা নিয়ে করা পত্রিকাটি যাত্রীদের মধ্যে দারুন জনপ্রিয় হয়েছিল। এই পত্রিকার মাধ্যমেই টমাস এডিসন একজন বিশাল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেন।

রেল স্টেশনের বগিতে মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি বিভিন্ন কেমিকেল মিশিয়ে পরীক্ষা করতেন। এরকমই এক পরীক্ষার সময়ে একটি ব্যাগেজ বগিতে আগুন ধরে যায়। ট্রেনের কন্ডাক্টর দৌড়ে এসে টমাসের কান্ড দেখে তার গালে চড় মেরে বসে, এবং সেই ট্রেনে টমাসের ওঠা নিষেধ করে দেয়।

এরপর থেকে টমাসকে ট্রেনে উঠে পত্রিকা বিক্রী করার বদলে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পত্রিকা বেচতে হতো।

টেলিগ্রাফ চালানো শেখা ও চাকরি জীবন:
এডিসন যখন রেলস্টেশনে কাজ করতেন, তখন একবার একটি ৩ বছরের বাচ্চাকে ট্রেনের নিচে পড়া থেকে বাঁচান। বাচ্চাটির বাবা ছিলেন একজন টেলিগ্রাফ অপারেটর, এবং তিনি টমাসকে প্রস্তাব দেন যে তিনি তাকে টেলিগ্রাফ মেশিন অপারেট করা শেখাতে চান। টমাস শিখতে শুরু করেন, এব‍ং ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি টেলিগ্রাফ অপারেটরের চাকরি করার মত দক্ষ হয়ে ওঠেন।

পরের ৫ বছর তিনি একজন ফ্রিল্যান্স টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে পুরো মধ্য-পশ্চিম আমেরিকা ঘুরে বেড়ান। সেই সময়ে আমেরিকায় সিভিল ওয়ার বা গৃহযুদ্ধ চলছিল, এবং অনেক টেলিগ্রাফ অপারেটর যুদ্ধে যোগ দেয়ার কারণে কাজের প্রচুর সুযোগ ছিল। অবসর সময়ে তিনি প্রচুর পড়াশুনা করতেন, এবং গবেষণা করতেন। টেলিগ্রাফের প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা করতে গিয়ে তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল সাইন্স নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারলেন এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞানের এই শাখাটিতেই তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ দেখিয়েছেন।

টমাস এডিসন: কাহিনী
১৮৬৬ সালে, ১৯ বছর বয়সে বার্তা সংস্থা “এপি” বা এ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এ টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে চাকরি নেন। নাইট শিফটের চাকরি হওয়ায় টমাস আলভা এডিসন নিজের গবেষণা ও পড়াশুনার জন্য অনেক সময় পেতেন। তিনি শুধু পড়েই থেমে যেতেন না, বিভিন্ন জিনিস নিয়ে সব সময়ে এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করে সেগুলো মিলিয়ে নতুন চিন্তা করার একটা স্বভাব গড়ে উঠতে থাকে।

বেশ কয়েক বছর টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে দারুন কাজ করার পর ১৮৬০ এর দশকের শেষ দিকে টমাসের কাজ কমে যেতে শুরু করল। কারণ, প্রথম দিকে কাগজে লেখা কোড পড়ে টেলিগ্রাফ অপারেট করতে হলেও, পরে যখন যান্ত্রিক শব্দ দিয়ে টেলিগ্রাফ এর অর্থ উদ্ধার করার নতুন প্রযুক্তি এলো, কানে কম শোনা টমাস এডিসন আর কাজ করতে পারছিলেন না।

১৮৬৮ সালে টমাস বাড়ি ফিরে দেখতে পেলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় মা ন্যান্সি এডিসন রীতিমত মানসিক রোগী হয়ে গেছেন। তাঁর বাবাকেও কাজ থেকে অবসর দেয়া হয়েছে। পুরো পরিবারের অবস্থাই তখন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। টমাস বুঝতে পারলেন যে, এই অবস্থা তাঁকেই সামাল দিতে হবে।

এক বন্ধুর পরামর্শে টমাস এডিসন বোস্টনে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে বিখ্যাত “ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়ন কোম্পানী”-তে কাজ নেন। সেই সময়ে বোস্টন ছিলো আমেরিকার বিজ্ঞান ও শিল্প চর্চার কেন্দ্র, টমাস আলভা এডিসনের জীবন কাহিনী এখানে সবচেয়ে বড় মোড়টি নেয়।

সেখানে থাকা অবস্থায়ই তিনি নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা শুরু করেন। তিনি একটি ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) রেকর্ডার তৈরী করেন এবং তার পেটেন্ট নিজের নামে করে নেন। কিন্তু তখনকার রাজনীতিবিদরা চাননি যে ভোট দেয়ার প্রক্রিয়া এত তাড়াতাড়ি হোক। তারা এই প্রক্রিয়া চালু করার জন্য আরও সময় চাচ্ছিলেন।

টমাস আলভা এডিসন এর সফল আবিষ্কারক ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা:
১৮৬৯ সালে, ২২ বছর বয়সী টমাস আলভা এডিসন নিউ ইয়র্ক শহরে পাড়ি জমান এবং তাঁর প্রথম সফল আবিষ্কারটি করেন। এটি ছিলো একটি স্টক টিকার প্রিন্টার, তিনি যার নাম দিয়েছিলেন “ইউনিভার্সাল স্টক প্রিন্টার”। স্টক টিকার হলো শেয়ার বা স্টক মার্কেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা স্টকের মূল্য ওঠা নামা করার সংকেত। টমাসের আবিষ্কারের ফলে কখন কোনটির দাম উঠছে বা নামছে – তা খুব সহজে দেখা যেতো, এবং একই সাথে টমাসের প্রিন্টার অনেকগুলো স্টক একসাথে দেখাতে পারতো। “গোল্ড এ্যান্ড স্টক টেলিগ্রাফ কোম্পানী” তাঁর কাজে দারুন মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ৪০ হাজার ডলার দিয়ে যন্ত্রটির স্বত্ব কিনে নেয়। ১৮৭০ এর দশকে ৪০ হাজার ডলার মানে বিশাল অংক।

এই সাফল্যের পর টমাস টেলিগ্রাফ অপারেটরের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি আবিষ্কারক হয়ে যাবেন বলে ঠিক করেন। ১৮৭০ সালে আমেরিকার নিউ জার্সিতে তিনি প্রথম তাঁর নিজের ল্যাব স্থাপন করেন। সেখানে কয়েকজন মেশিন অপারেটরও নিয়োগ দেন।
তাঁর ল্যাবটি আসলে ছিলো তাঁর ব্যবসায়িক কারখানা। সেখানে তিনি নতুন নতুন যন্ত্র তৈরী করতেন, এবং সবচেয়ে বেশি দাম যে দিতে পারতো- তার কাছে বিক্রী করতেন। যে টেলিগ্রাফ দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু, সেই যন্ত্রের উন্নতিও তিনি করেছিলেন। প্রথম ল্যাব থেকেই তিনি “কোয়ার্ডার প্লেক্স” টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করলেন, যা একটি তারের মধ্যদিয়ে দুইটি আলাদা জায়গায় সিগন্যাল পাঠাতে পারতো। সেই সময়ে এটা ছিল একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার।

[নিজের আবিষ্কার করা অডিও রেকর্ডারের সামনে টমাস আলভা এডিসন]
ধনকুবের জে-গোউল্ড এর কোম্পানী তাঁর কাছ থেকে যন্ত্রটির স্বত্ব ১ লক্ষ ডলারেরও বেশি মূল্য দিয়ে কিনে নেয়। যা বর্তমানের ২ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি‍!
১৮৭৬ সালে টমাস তাঁর কার্যক্রম নিউজার্সির মেনলো পার্ক নামক জায়গায় স্থানান্তর করেন। সেখানে তিনি উন্নত ল্যাবরেটরি ও মেশিন ওয়ার্কশপ সহ একটি ইনডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ফ্যাসিলিটি তৈরী করেন।

সেই বছরই ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়ন কোম্পানী তাঁকে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল এর টেলিফোনের সাথে প্রতিযোগীতা করার মত একটি ডিভাইস তৈরী করতে অনুরোধ করে। তিনি অবশ্য তা করেননি। পরের বছর তিনি ফোনোগ্রাফ আবিষ্কার করেন, যেটি আসলে প্রথম কার্যকর অডিও রেকর্ডিং যন্ত্র। যদিও এই ফোনোগ্রাফ সাধারণ মানুষের কাছে আসতে আরও ১০ বছরের মত লেগেছিল, কিন্তু এই যন্ত্রের মাধ্যমেই এডিসন প্রথমবারের মত সারা বিশ্বে বিখ্যাত হন।

ব্যবহারযোগ্য ইলেকট্রিক বাল্ব:
অনেকেরই ধারণা যে প্রথম ইলেকট্রিক বাল্ব টমাস এডিসনের আবিষ্কার। এটা আসলে পুরোপুরি ঠিক নয়। এর আগেও অনেকে গ্যাস ও আগুনের বাতির বিকল্প নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৮০০ সালে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্‌টা থেকে শুরু করে বৃটিশ বিজ্ঞানী হামপ্রে ড্যাভি, হেনরি উডওয়ার্ড ও ম্যাথু ইভান্স পর্যন্ত অনেকেই চেষ্টা করেছেন ইলেকট্রিসিটি চালিত বাতি তৈরী করার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা সফল হলেও, সাধারণ মানুষের ব্যবহার করার মত, এবং ব্যবসায়িক ভাবে বিক্রীর যোগ্য করে কেউ এই বাতি বানাতে পারেননি। কথিত আছে, টমাস আলভা এডিসনকেও সফল ভাবে ইলেকট্রিক বাতি বানাতে গিয়ে ১০ হাজার বার ব্যর্থ হতে হয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে পরে তিনি বলেছিলেন “আমি ১০ হাজার বার ব্যর্থ হইনি, আমি এটি কাজ না করার ১০ হাজারটি কারণ বের করেছি”।

তিনি উডওয়ার্ড ও ইভান্স এর গবেষণার স্বত্ব বা কপিরাইট কিনে নিয়ে তাদের প্রজেক্টের ওপর গবেষণা চালাতে থাকেন, এবং ১৮৭৯ সালে তিনি আধুনিক লাইট বাল্বের সফল ডিজাইনটি করতে সক্ষম হন। অন্য সবার মত, টমাসও কাজটি করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু অন্যরা ব্যর্থ হয়ে গবেষণা থামিয়ে দিলেও টমাস তা চালিয়ে গিয়ে অবশেষে সফল হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আধুনিক লাইট বাল্বের পেটেন্টটি নিজের নামে করে নেন।

১৮৮০ সালের জানুয়ারিতে তিনি তাঁর ইলেকট্রিক কোম্পানী গড়ার কাজ শুরু করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিলো পৃথিবীর সব শহরে তিনি বিদ্যু‌ৎ ও আলো পৌঁছে দেবেন। সেই বছর তিনি “এডিসন ইল্যুমিনেটিং কোম্পানী” প্রতিষ্ঠা করেন। পরে যেটি “জেনারেল ইলেকট্রিক কর্পোরেশন” নামে পরিচিতি পায়। জেনারেল ইলেকট্রিক এখনও পৃথিবীর সেরা ইলেকট্রিক কোম্পানী গুলোর একটি।
১৮৮১ সালে টমাসের কোম্পানী বেশ কয়েকটি শহরে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা শুরু করেন। ১৮৮২ সালে তাঁর কোম্পানী ম্যানহাটনের ৫৯টি বাড়িতে তাদের বিদ্যু‌ৎ ও আলোর সেবা দেয়া শুরু করে।

টমাস এডিসনের অন্যান্য আবিষ্কার ও উদ্যোগ:
১৮৮৭ সালে আমেরিকার নিউ জার্সির ওয়েস্ট-অরেঞ্জ নামক জায়গায় টমাস বিশাল একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি লাইট ও বিদ্যু‌ৎ এর প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি, ফোনোগ্রাফ এবং মোশন পিকচার ক্যামেরার কার্যকর মডেল তৈরী করেন। এছাড়া আধুনিক ব্যাটারীও তৈরী করেন, যা অনেক বেশি সহজে অনেক বেশি বিদ্যু‌ৎ ধরে রাখতে পারতো।

এর পরের কয়েক দশকে এডিসন আবিষ্কারকের পাশাপাশি দক্ষ একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ও বিজনেস ম্যানেজার হয়ে উঠতে থাকেন, যা আমেরিকার অর্থনীতির আজকের পর্যায়ে আসার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। যদিও প্রথম দিকে তিনি কর্পোরেট পরিবেশে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছিলেন না, তবে ধীরে ধীরে তিনি ব্যাপারটা শিখে নেন।

১৮৯৬ সালের ২৩শে এপ্রিল নিউ ইয়র্ক শহরের ‘কোস্টার এ্যান্ড বিয়াল’স মিউজিক হল’ এ, ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এডিসন চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন।

২০ শতকের (১৯০১-২০০০) শুরুর দিকে যখন মোটর গাড়ির ব্যবহার শুরু হচ্ছিল, এডিসন ইলেকট্রিক কার নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। তিনি এমন একটি ব্যাটারি বানাতে চাইছিলেন যা একটি গাড়িকে যথেষ্ঠ সময় চালানোর মত এনার্জি ধরে রাখতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত ইলেকট্রিক গাড়ির চেয়ে তেলে চলা গাড়িই পায়। এর একটি প্রধান কারণ, আজকের দিনের মত তখন ইলেকট্রিসিটি এতটা সহজে পাওয়া যেত না। টমাস পরে তাঁর বন্ধু ফোর্ড মোটরস এর প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড এর জন্য গাড়ির যন্ত্রাংশ বানিয়ে দেন। টমাস আলভার বানানো প্রযুক্তি দশকের পর দশক ধরে গাড়িতে ব্যবহার হয়েছে। আজকের জনপ্রিয় গাড়ির ব্র্যান্ড ইলন মাস্ক এর “টেসলা মোটরস” এর গাড়িগুলো টমাস আলভা এডিসনের ইলেকট্রিক কারের আইডিয়া থেকেই অনুপ্রাণিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সরকার তাঁকে “ন্যাভাল কনসালটিং বোর্ড” এর প্রধান হতে অনুরোধ করে। এই বোর্ডটি সেনাবাহিনী ও নৌ বাহিনীর অস্ত্র পরীক্ষা ও তার উন্নয়ন করতো। দেশপ্রেমের জায়গা থেকে তিনি কাজটি করতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু নীতিগত জায়গা থেকে হত্যা ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে থাকার কারণে, মিসাইল ডেটেক্টর, অস্ত্রের লোকেশন বের করার টেকনিক – ইত্যাদি প্রজেক্টে কাজ করলেও কোনও অস্ত্র বানানোর প্রজেক্টে তিনি কাজ করেননি। তাঁর সাথে সরকারের চুক্তির শর্তই ছিল যে, তিনি শুধু ডিফেনসিভ ও টেকনিক্যাল বিষয়গুলোতে কাজ করবেন। পরে তিনি বলেছিলেন: “আমি গর্বিত যে আমি কখনওই এমন কিছু আবিষ্কার করিনি, যা দিয়ে খুন করা যায়”

টেসলা ও এডিসন:
অবশ্য আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার সাথে তাঁর প্রতিদ্বন্দীতার ঘটনা বিজ্ঞানী মহলে আজও জনপ্রিয়। এডিসনের কোম্পানীতে এই ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী কিছুদিনের জন্য কাজ করতে এসেছিলেন। দুইজনই অসামান্য প্রতিভাবান হলেও দুইজনের কাজের ধরন ও দর্শন ছিল আলাদা। এডিসনের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গীকে টেসলা কোনওদিনই ভালো চোখে দেখেননি। এছাড়া বিদ্যুতের ব্যবহার কেমন হওয়া উচি‌ৎ – এই নিয়েও দুইজনের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। ১৮৮৫তে এই দুই মহান বিজ্ঞানীর বিরোধ রীতিমত খবরের কাগজের শিরোনাম হয়ে উঠছিল।

টেসলা পরে “জর্জ ওয়েসটিংহাউজ” এর সাথে পার্টনারশিপে যান, জর্জ আসলে ছিলেন এডিসনের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দী। এতে তাঁদের বিরোধ আরও চরমে ওঠে। অনেকেই দাবী করেন, টেসলার অনেক আবিষ্কার এডিসন কৌশলে নিজের নামে করে নিয়েছেন, এবং এডিসনের কারণেই টেসলা নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ করতে পারেননি। আজও বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান ভক্তরা টেসলা ও এডিসন – এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে আছেন।

টমাস আলভা এডিসনের পারিবারিক জীবন:
১৮৭১ সালে টমাস মেরি স্টিলউয়েল নামের ১৬ বছরের এক নারীকে বিয়ে করেন। মেরি তাঁর একটি কোম্পানীতেই কাজ করতেন। মেরি ও এডিসনের তিন সন্তান হয়েছিল। টমাসের প্রথম সন্তান মেয়ে ম্যারিওনের ডাক নাম ছিল “ডট”; ম্যারিওনের পরে জন্মান টমাস আলভা এডিসন জুনিয়র, তাঁর ডাকনাম ছিল “ড্যাশ”; টমাস-মেরি দম্পতির তৃতীয় সন্তান উইলিয়াম এডিসন নিজেও একজন সফল বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক হয়েছিলেন।

১৮৮৪ সালে মেরি ব্রেন টিউমারে মারা যান, এবং ১৮৮৬ সালে টমাস তাঁর চেয়ে ১৯ বছরের ছোট মিনা মিলারকে বিয়ে করেন।
দ্বিতীয় স্ত্রী মিনার গর্ভেও দুই ছেলে ও এক মেয়ে জন্মায়। দুই পুত্র থিওডোর ও চার্লস, এবং কন্যা ম্যাডেলিন এডিসন।

মৃত্যু:
১৯২০ দশকের শেষের দিকে, টমাসের বয়স যখন আশির ঘরে, তাঁর বেশিরভাগ সময়ই কাটতো ফ্লোরিডাতে। সেখানেই আধুনিক গাড়ির জনক হেনরি ফোর্ড এর সাথে তাঁর বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। ওই বয়সেও তিনি ইলেকট্রিক ট্রেন এর মত প্রজেক্টে কাজ করেছেন তিনি।

[পৃথিবী বদলে দেয়া দুই বন্ধু: হেনরি ফোর্ড ও টমাস আলভা এডিসন (পেপার হাতে) ]
১৯৩১ সালের ১৮ই অক্টোবর, ওয়েস্ট অরেঞ্জ এর নিজ বাড়িতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ৮৪ বছর বয়সী মহান বৈজ্ঞানিক। তাঁর মৃত্যুর পর সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আলো কমিয়ে বা কিছুক্ষণের জন্য ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে এই আলোর কারিগরকে সম্মান জানানো হয়। গল্প চালু আছে যে, বন্ধু হেনরি ফোর্ড, টমাসের শেষ নি:শ্বাস একটি বোতলে ভরে রেখেছিলেন। যদিও এর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শেষ কথা:
অনেক নিন্দুক বলেন টমাস লোক ভালো ছিলেন না। তিনি তাঁর আবিষ্কারগুলো দিয়ে ‘ব্যবসা’ করে গেছেন। কিন্তু তাঁর এই ‘ব্যবসা’র কারণেই সারা পৃথিবীর মানুষ আধুনিক জীবনযাত্রা উপভোগ করতে পারছে। এত ব্যস্ততার পরও তিনি কখনও তাঁর পরিবারকে অবহেলা করেননি। সারা পৃথিবীকে আলোকিত করার স্বপ্ন তিনি নিজ হাতে পূরণ করে গেছেন। আজকের দিনের আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি যে কয়জন মানুষের হাতে গড়া, তাঁদের মাঝে টমাস আলভা এডিসন নিশ্চই সেরাদের একজন।

10/04/2020

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র পেতে হলে আপনাকে সত্যিকার সফল উদ্যোক্তাদের কাছেই যেতে হবে। একাডেমিকরা হয়তো আপনাকে থিওরি বলতে পারবেন, হিসাব দেখাতে পারবেন। কিন্তু সত্যিকার জীবনে যাঁরা সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন – তাঁরাই শুধু সফল উদ্যোক্তা হওয়ার সত্যিকার মূলমন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। একাডেমিক বা ইন্সটিটিউশনাল জ্ঞান গুলোকে বাস্তব জীবনে সত্যিকার কাজে লাগানোর জন্য আপনাকে সত্যিকার সফল উদ্যোক্তাদের কাছেই যেতে হবে।

বিজনেস ইন্সটিটিউটের বইয়ের চেয়ে অনেক সময়ে সেলফ ডেভেলপমেন্ট বইগুলো বেশি কাজে লাগে, কারণ, ব্যবসা সম্পর্কিত বেশিরভাগ বেস্ট সেলিং সেলফ ডেভেলপমেন্ট বই লেখা হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রের সফল মানুষদের ওপর গবেষণা করে। তাঁদের জ্ঞান, অভ্যাস, কাজ করার ধরন – ইত্যাদি এ্যানালাইসিস করে লেখকরা সফল মানুষদের কমন গুণ ও কাজের ধরন গুলো খুঁজে বের করেন। যেগুলো সবারদ উপকারে আসতে পারে।

নেপোলিয়ন হিল তাঁর সেলফ ডেভেলপমেন্ট ক্লাসিক “থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ” লেখার আগে কয়েক বছর ধরে ৫০০ জন অসাধারণ সফল মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এবং তাঁদের ওপর গবেষণা করেছেন। “স্মার্টার ফাস্টার বেটার” বইয়ের লেখক চার্লস ডুহিগ ও একই কাজ করেছেন। এই বইগুলোতে সাধারণ ভাবে, অতি সফল মানুষদের সাফল্যের পেছনের কারণগুলো এমন ভাবে তুলে ধরা হয়, যাতে সেগুলো কাজে লাগিয়ে পাঠকরাও তাঁদের জীবনে সফল হতে পারেন।

লেখক, সাংবাদিক, ও গবেষক কেভিন ক্রুজ এই কাজটিই করেছেন। তবে তিনি বই লেখেননি। বর্তমান সময়ে জীবিত ২০০ জন সফল মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যাঁদের বেশিরভাগই সফল উদ্যোক্তা, এর মধ্যে রিচার্ড ব্র্যানসন, ওয়ারেন বাফেট সহ ৭জন বিলিওনেয়ার আছেন।

তিনি সবাইকেই খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছেন: ”আপনার অসাধারণ প্রোডাক্টিভিটি বা কর্মক্ষমতার পেছনের ১ নম্বর কারণটি কি?”

এর উত্তর এক একজন এক এক ভাবে দিয়েছেন, তবে এর মাঝে ১২টি বিষয় সবচেয়ে বেশিবার উঠে এসেছে, এবং ইন্টারভিউ দেয়া প্রায় সবাই এর কোনও না কোনওটি ফলো করেন।

এই বিষয়গুলো নিয়ে কেভিন “বিজনেস ইনসাইডার” এ একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি বিষয়গুলো সুন্দর ভাবে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন। আমরা আজ সেই ১২টি বিষয়কে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার ১২টি মূলমন্ত্র আকারে আপনার সামনে তুলে ধরছি, যাতে আপনিও সেগুলো কাজে লাগিয়ে নিজের সাফল্যকে আরও উন্নত করতে পারেন।

তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক –

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র সমূহ:
০১. সফল উদ্যোক্তারা ঘন্টার বদলে মিনিট হিসাব করে কাজ করেন
সফল উদ্যোক্তা
বেশিরভাগ মানুষ ঘন্টা হিসাব করে কাজ করেন। এমনকি উদ্যোক্তারাও দিনে কয় ঘন্টা কাজ করলেন – এটাই হিসাব করেন। কিন্তু ক্রুজ এর ভাষায় “আলট্রা সাকসেসফুল” বা অতি সফল উদ্যোক্তারা কাজ করেন মিনিটের হিসেবে।

ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেরা সফল উদ্যোক্তারা দিনে ২৪ ঘন্টার বদলে পুরো ১৪৪০ মিনিট নিয়েই সচেতন থাকেন। এবং তাঁরা বোঝেন জীবনে সময়ের মূল্য সবচেয়ে বেশি। টাকা গেলে টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু সময় গেলে আর তা ফিরে পাওয়া যায় না।”

বিল গেটস কে নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে। তাঁর ডেস্ক থেকে একবার কয়েক হাজার ডলার পড়ে গিয়েছিল। তিনি সেটা আর তোলেননি। কারণ, সেটা তুলতে গিয়ে তাঁর যতটা সময় খরচ হত, সেই সময় কাজে লাগিয়ে তিনি আরও বেশি টাকা আয় করতে পারতেন।

এই গল্প সত্যি কি মিথ্যা – এটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু গল্পের পেছনের মেসেজটা দিনের আলোর মত সত্যি। সময়কে যে কোনও কিছুর চেয়ে বেশি মূল্য দিলে, সময় তা বহু গুণে ফিরিয়ে দেয়।

কাজেই, সফল উদ্যোক্তা হওয়ার অন্যতম মূল মন্ত্র হল, প্রতিটি মিনিট এর ব্যাপারে সচেতন থেকে কাজ করতে হবে। যদি ১ ঘন্টা কাজ করেন, তবে খেয়াল রাখুন ৬০টি মিনিটই যেন কাজে লাগে। দেখবেন, ১ ঘন্টার কাজ ১ ঘন্টার অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। বাকি সময়টা আপনি অন্য জরুরী কাজে লাগাতে পারবেন। এতে প্রোডাক্টিভিটি অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

০২. এক সময়ে শুধু একটি কাজেই মনোযোগ দিন
উদ্যোক্তা
ফোকাস হল অসাধারণ সফল হওয়ার আরেকটি অন্যতম মূলমন্ত্র। আপনি যখন যেটাই করছেন, সেটাতে পূর্ণ মনোযোগ দিন। তারচেয়েও বড় কথা, দিনের কাজের শুরুটা করুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিয়ে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার জানা থাকার কথা যে, কোন কাজটি করা আপনার ব্যবসার উন্নতির জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরী।

বেশিরভাগ ”আলট্রা সাকসেসফুল বিজনেস পিপল” – তাঁদের দিনের কাজ শুরু করার পর ২ ঘন্টা গভীর ভাবে একটি কাজই করেন – যে কাজটি তাঁদের ব্যবসার জন্য সবচেয়ে জরুরী। এই সময়ে তাঁরা কারও সাথে কথা বলেন না, বা অন্য কোনও দিকে মনোযোগ দেন না।

এই ‘ডিপ ওয়ার্ক’ আওয়ারে তাঁদের প্রোডাক্টিভিটি সেরা পর্যায়ে থাকে, এবং দিনের বাকি কাজগুলোও তাঁরা অনেক গুছিয়ে করতে পারেন। আপনিও দিনের কাজ শুরুর পর প্রথম ২ ঘন্টা কি করবেন – সেদিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিন। আশা করা যায় আপনার কাজের মান অনেক বেড়ে যাবে।

০৩. ক্যালেন্ডার ধরে কাজ করুন

কিছু মানুষ তাঁদের দিনে একদম ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় কাজও শিডিউলের মধ্যে রাখেন। কেভিন ক্রুজ ২০০ জন অতি সফল মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানতে পেরেছেন, এতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। আপনি যদি অগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও শিডিউল করে রাখেন, তার কমবেশি ৪১% করতে পারবেন না। এইসব না করা কাজ অবচেতন মনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

GTD মেথডও এই কথাই বলে। ছোট ছোট কাজ শিডিউল করে, না করার ফলে সেগুলো অবচেতন মনে থেকে যায়, যার ফলে ”Zeigarnik effect“ নামক একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার কারণে অহেতুক মানসিক চাপ, নিদ্রাহীনতা – ইত্যাদি হয়।

অতি সফল মানুষরা দিনের সব ছোটছোট বিষয় শিডিউলে না রেখে, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কাজ করেন। অর্থাৎ, তাঁরা কোন তারিখে কোন কাজটা শেষ করেবন – তা শিডিউল করে রাখেন। এবং সেই জরুরী কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগ করে দিনের শিডিউলে ঢোকান। এতে তাঁদের ফোকাস শুধু জরুরী কাজগুলোতেই থাকে, এবং অহেতুক মানসিক চাপ নিতে হয় না।

০৪. ঢিলেমি বন্ধ করার জন্য ঢিলেমির ফলাফল আগে ভাবুন

সফল উদ্যোক্তা হওয়া, বা অন্য যে কোনও বিষয়ে সফল হওয়ার জন্য ঢিলেমি বাদ দেয়াটা একটি জরুরী মূলমন্ত্র। ঢিলেমির কুফল খুবই ভয়াবহ। বহু প্রতিভাবান ও দক্ষ মানুষ শুধুমাত্র এই ঢিলেমি বা কাজ ফেলে রাখার কারণে জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন।

সাধারণ মানুষদের মত, সফল মানুষদেরও ইচ্ছা হয় কাজ ফেলে বিশ্রাম নিতে, মুড না থাকলে একটু জিরিয়ে নিতে, প্রিয় সিনেমা বা টিভি সিরিজটা রিলিজের দিনই দেখে ফেলতে – ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা এইসব ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখেন, কারণ তাঁরা জানেন, কাজ ফেলে রাখলে বা ঢিলেমি করলে ভবিষ্যতে কি হবে।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন, তাঁরা কি জাদু জানেন, অথবা টাইম ট্রাভেল করতে পারেন, নাকি ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন?

এর কোনওটাই নয়। তাঁরা এমন একটি ক্ষমতা কাজে লাগান, যা প্রতিটি মানুষেরই আছে। তা হল, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পারা, এবং কল্পনা করতে পারা।

যখনই তাঁদের ঢিলেমি করার ইচ্ছা হয়, তাঁরা কল্পনা করেন যে, ঢিলেমি করে কাজ ফেলে রাখলে ভবিষ্যতে তাঁদের কি কি ক্ষতি হতে পারে। হয়তো সময়মত কাজ শেষ না করতে পারলে অনেক দিনের কাজ করা প্রজেক্ট হয়তো সময়মত জমা দিতে পারবেন না। হয়তো ক্লায়েন্টের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যেতে পারে, অথবা সময়মত প্রোডাক্ট ডেলিভারি দিতে না পারায় বিরাট লস হতে পারে – ইত্যাদি।

একটু যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলেই, কাজ ফেলে রাখার কুফল গুলো ভাবতে পারা যায়। আর এগুলো কল্পনা করলে এমনিতেই আপনার এড্রিনলিন হরমোন কাজ করা শুরু করবে। যার ফলে নিজের প্রাকৃতিক বেঁচে থাকার প্রবণতা বা “সারভাইভাল ইন্সটিংকস” থেকেই আপনি আবার কাজ করা শুরু করবেন। – এড্রিনলিন হরমোন সাধারণত বিপদের মুখে, বা চ্যালেঞ্জের মুখে মানুষকে এ্যাকটিভ করে।

আমাদের ব্রেন যেহেতু কল্পনা ও বাস্তবে একই রিএ্যাকশন দেখায়, সেহেতু কাজ না করার বিপদ কল্পনা করলে, এমনিতেই ভেতরে কাজ করার তাগিদ তৈরী হবে। সফল মানুষরা সচেতন ভাবে বা অবচেতন ভাবে এটাকে নিয়মিত কাজে লাগান। আপনিও চেষ্টা করুন।

০৫. ব্যবসার বাইরেও একটা জীবন রাখুন
সফল উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে অবশ্যই ব্যবসা আপনার অন্যতম প্রধান কাজ। কেভিন ক্রুজ এ প্রসঙ্গে ইন্টেল কর্পোরেশনের প্রয়াত সিইও ও চেয়ারম্যান এ্যান্ড্রু গ্লোভ (১৯৩৬-২০১৬) এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সেরা সাফল্য পাওয়া উদ্যোক্তারা খুব ভালো করে জানেন যে, জীবনে কোন কোন জিনিস তাঁদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হ্যাঁ, তাঁরা তাঁদের কাজকে ভয়ানক মূল্য দেন। কিন্তু এর বাইরেও জীবনে মূল্যবান কিছু আছে। লিজেন্ডারি সফল উদ্যোক্তারা ব্যবসার পাশাপাশি নিজের পরিবারকেও মূল্য দেন। একজন মানুষের জীবনের শেষে তাঁর অবদানের পাশাপাশি তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে কি, এবং পরিবারের কাছে কি – এগুলো আরও বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায়। এইজন্যেই ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস, জেফ বেজোস, অথবা জ্যাক মা এর মত বড় বড় বিলিওনেয়ার তাঁদের বেশিরভাগ অর্থ মানব কল্যানে দান করে দেন, সেইসাথে নিজেদের সন্তান ও পরিবারকে যথেষ্ঠ সময় দেন। ইলন মাস্ক সময় পেলেই তাঁর ছেলেদের নিয়ে ট্যুরে যান, এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত নিজের ছেলেদের সময় দেন।

আমাজন ফাউন্ডার জেফ বেজোস দেশে থাকলে পরিবারের সাথে সকালের নাস্তা করা কখনওই মিস করেন না।

পারিবারিক বন্ধন ও ভালোবাসা না থাকলে দিন শেষে মানুষের জীবন অর্থহীন। অসাধারণ সফল মানুষরা এটা খুব ভালো করেই জানেন। বেশিরভাগ হলিউড সেলিব্রেটিদের মত ছন্নছাড়া জীবন তাঁদের নয়। প্রায়ই খবর আসে অমুক সেলিব্রেটি জুয়া খেলে, নেশা করে বা অন্য ভাবে সব টাকা হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গেছেন। উদ্যোক্তাদের বেলায় কিন্তু তেমনটা ঘটে না। কারণ টাকা ও গ্লামারের বাইরেও তাঁদের একটা অর্থপূর্ণ জীবন থাকে।

০৬. পড়া ও লেখার অভ্যাস
সফল উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র
সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পড়ার ও লেখার অভ্যাস থাকাটা একটি অন্যতম মূল মন্ত্র। এই অভ্যাস ছাড়াও হয়তো আপনি একটা পর্যায়ের সফল উদ্যোক্তা হতে পারবেন – তবে সেটা কখনওই স্টিভ জবস, অথবা জ্যাক মা লেভেলে যাবে না।

ওয়ারেন বাফেট এখনও দিনে ৫০০ পৃষ্ঠা পড়েন, ইলন মাস্ক সময় পেলেই বইয়ের মাঝে ডুবে থাকেন, বিল গেটস বছরে ৫০টি বই পড়েন, মার্ক জুকারবার্গ তাঁর ব্যবসা প্রসারণের জন্য নিয়মিত বিভিন্ন দেশের কালচার ও মানুষ নিয়ে পড়াশুনা করেন।

আর লেখার প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলতে হয়, এখানে কিন্তু গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধ লেখার কথা বলা হচ্ছে না। নিজের লক্ষ্য, পরিকল্পনা, আইডিয়া ইত্যাদি নিয়ে নিজের মত লেখার কথা বলছি। ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বিলিওনেয়ার রিচার্ড ব্র্যানসন একাধিক বার বলেছেন যে, তিনি ভার্জিন গ্রুপকে সফল করতে পারতেন না – যদি না তিনি একটি ছোট্ট খাতা নিয়ে সব সময়ে না ঘুরতেন। গ্রীক শিপিং ম্যাগনেট এ্যারিস্টটল ওনাসিস (দার্শনিক এ্যারিস্টটল নন, আধুনিক যুগের ব্যবসায়ী এ্যারিস্টটল) বলেছেন, “সব সময়ে একটি খাতা সঙ্গে রাখবে। মাথায় যা আসবে, লিখে ফেলবে। এটা একটা মিলিয়ন ডলার লিসন – যেটা কোনও বিজনেস ইন্সটিটিউট তোমাকে শেখাবে না”

কেভিন ক্রুজ লিখেছেন, “আলট্রা সাকসেসফুল মানুষরা সবকিছু লিখে রাখার মাধ্যমে তাঁদের মাথাকে পরিস্কার রাখেন। জরুরী বিষয় লিখে ফেললে সেগুলো আপাতত মাথায় খোঁচাখুঁচি করবে না। কিন্তু সেগুলো নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে। সর্বকালের সেরা জিনিয়াস লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এটা খুব কঠোর ভাবে ফলো করতেন। পৃথিবীর প্রায় সব সেলফ ডেভেলপমেন্ট কোচই নিজের লক্ষ্য আর আইডিয়া লিখে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। – সফল হওয়ার মূলমন্ত্র হিসেবে আপনিও একে কাজে লাগাতে পারেন।

০৭. ইমেইল ও নোটিফিকেশন কম চেক করুন

সেরা সফল উদ্যোক্তারা সারাদিন ইমেইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন চেক করেন না। বা টুং করে মেইল বা নোটিফিকেশন আসার শব্দ হলেই সেদিকে মনোযোগ দেন না। এর বদলে অন্য সব কিছুর মত এটার জন্যও তাঁদের নির্দিষ্ট সময় থাকে। হয়তো দিনে লাঞ্চের পর আধা ঘন্টা মেইল ও নোটিফিকেশন চেক করেন। সেখানে খুব কম সময়েই জরুরী কিছু থাকে। বেশিরভাগই দিনে মাত্র একবার এসব চেক করেন। অনেকে একবারও করেন না। নিজের পিএস এর কাছে এসব দায়িত্ব দেন। তেমন জরুরী কিছু হলেই কেবলমাত্র তাঁদের জানানোর অনুমতি থাকে।

০৮. মিটিং এর পেছনে বেশি সময় নষ্ট করবেন না
মিটিং উদ্যোক্তা
কেভিন ক্রুজ আমেরিকান বিলিওনেয়ার মার্ক কিউবান এর সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়ে তাঁর সেরা প্রোডাক্টিভিটি টেকনিক জানতে চাইলে কিউবান বলেছিলেন যে, ফলপ্রসূ হবে না মনে হলে মিটিং এর পেছনে বেশি সময় নষ্ট করবেন না।

মিটিং সময় নষ্ট করার একটি অন্যতম মাধ্যম। অনেক উদ্যোক্তা মিটিং এর পেছনে অতিরিক্ত সময় দিতে গিয়ে কাজের সময় নষ্ট করে ফেলেন। যে কোনও বিজনেস মিটিং এ অবান্তর কথা এড়িয়ে চলুন। দ্রুত কাজের কথা শুরু ও শেষ করা সফল বিজনেস মিটিং এর অন্যতম মূলমন্ত্র। মূল বিষয় ছেড়ে কথা অন্যদিকে মোড় নিলে কথাকে আবার পয়েন্টে নিয়ে আসুন। এবং যত তাড়াতাড়ি পারা যায় সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করুন। এতে সময় নষ্ট হবে না। একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রতিটি মিনিটকে সত্যিকার কাজে লাগানো অপরিহার্য।

০৯. ’না’ বলতে শিখুন

সর্বকালের সেরা একজন উদ্যোক্তা ওয়ারেন বাফেট এর একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, “সাধারণ সফল আর অসাধারণ সফলদের মধ্যে পার্থক্য হল, অসাধারণ সফলরা প্রায় সবকিছুকেই ‘না’ বলে”।

”প্যারেটো প্রিন্সিপাল” বা ৮০/২০ প্রিন্সিপাল অনুযায়ী, ২০% কাজের ওপর মানুষের ৮০% সাফল্য নির্ভর করে। অসাধারণ সফল উদ্যোক্তারা কোনও সুযোগ সামনে আসলেই তা লুফে নেন না। তাঁরা জানেন, বেশিরভাগ কাজে হাত দিতে গেলে তাঁদের মূল কাজটাই করা হবে না। তাঁরা শুধু সেই কাজগুলোই করেন, যেগুলো তাঁদের মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। বাকি সব কিছুকেই তাঁরা না বলেন। সঠিক ভাবে বিবেচনা করে ’না’ বলতে শেখা সফল উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র হিসেবে খুবই জরুরী।

১০. সবকিছু একা করতে যাবেন না

সবকিছু একা করতে গেলে শেষে কিছুই ভালোমত করা যায় না। এইজন্যেই সফল ব্যবসার জন্য টিম ওয়ার্ক এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

কেভিন লিখেছেন, অসাধারণ সফল উদ্যোক্তারা সব ব্যাপারে “আমি কিভাবে কাজটি করতে পারি?” জিজ্ঞাসা করার বদলে জিজ্ঞাসা করেন “কিভাবে কাজটি সবচেয়ে ভালোভাবে হতে পারে?”

আল্ট্রা প্রোডাক্টিভ মানুষেরা সবকিছু একা নিয়ন্ত্রণ করতে চান না। একটি প্রোডাক্ট বা সার্ভিস বাজারে ছাড়ার সময়ে মার্কেটিং, বাজেটিং, প্রোডাকশন, ইঞ্জিনিয়ারিং – সব দায়িত্ব একজনের কাঁধে না নিয়ে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী সেরা কাজটি বেছে নিয়ে, অন্যদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেন। এতে কাজ দ্রুত ও মান সম্পন্ন হয়। একজন উদ্যোক্তা সবকিছুর খোঁজখবর রাখবেন ঠিকই, কিন্তু সবকিছু একাই নিয়ন্ত্রণ করতে যাবেন না।

১১. একবারের জিনিস দুইবারে করবেন না

একজন সেরা সফল উদ্যোক্তা একটি কাজ ধরে সেটা শেষ করে আরেকটি কাজ ধরেন। একটি কাজ একটু করে আবার সেটা রেখে দিয়ে অন্য কাজ ধরেন না। সাইকোলজিতে ”রেসিডিউ অব থট” বলে একটা কথা আছে: আগের কোনও কাজ অসম্পূর্ণ রেখে আরেকটি কাজ ধরলে, আগের কাজের ফেলে আসা চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। ফলে পরের কাজটিও ভালোমত হয় না।

পারফেক্ট ভাবে কাজ করতে হলে একটি কাজ ধরে শেষ করে তবেই আরেকটি কাজে হাত দিতে হবে। কেভিন লিখেছেন, এতে করে মানসিক চাপ কমবে, এবং আপনি সব কাজই অনেক হাল্কা মেজাজে সুন্দর ভাবে করতে পারবেন।

১২. ভালো একটি সকালের রুটিন ফলো করুন

কেভিন ২০০ সফল মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি কমন যে জিনিসটি পেয়েছেন, তা হল প্রায় সব সফল মানুষের নির্দিষ্ট প্রোডাক্টিভ সকালের রুটিন আছে। সফল মানুষের রুটিন গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কমন ছিল, খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা, তারপর মেডিটেশন বা প্রার্থণা করা, এক্সারসাইজ করা, অনুপ্রেরণামূলক বই পড়া বা লেকচার শোনা, নিজের উদ্দেশ্যে ভালো কিছু লেখা, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর নাস্তা করা এবং পরিচ্ছন্ন হওয়া।

সকালের রুটিন নিয়ে লেখা সেরা একটি সেলফ ডেভেলপমেন্ট বই, মিরাকেল মর্নিং এও মোটামুটি এই ধরনের সকালের রুটিন এর কথাই বলা হয়েছে।

সকালটা যদি সুন্দর ও প্রোডাক্টিভ ভাবে শুরু করা যায়, তবে দিনটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই, যে কোনও ক্ষেত্রেই সফল হওয়ার একটি মূলমন্ত্র হতে পারে একটি সঠিক মর্নিং রুটিন।
Tamzid Rahman

Address

Haragach
Rangpur
5441

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Suzerain Incorporation posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Suzerain Incorporation:

Share