04/03/2026
ধর্ম মানুষের পথপ্রদর্শক, কিন্তু মানুষ যখন ধর্মকে ভীরুতার আবরণ করিয়া তোলে, তখন সেই পথপ্রদর্শকই পরিণত হয় প্রাচীরে। আমরা আয়াত উচ্চারণে যত তৎপর, তাহার ব্যঞ্জনা অনুধাবনে তত নই। কোরআনের সূরা আল মায়িদা ৫১ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ইহুদি ও নাসারাদেরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করো না। বহুজন এখানে অভিভাবক শব্দটিকে কেবল বন্ধু অর্থে ধরিয়া নেন। অথচ আরবি আওলিয়া শব্দের মধ্যে আছে রাজনৈতিক আনুগত্য, সামরিক মিত্রতা, কর্তৃত্ব স্বীকারের ভাব। ব্যক্তিগত সৌজন্য বা সামাজিক সহাবস্থানকে নিষিদ্ধ করাই এ আয়াতের লক্ষ্য ছিল বলিয়া অধিকাংশ তাফসিরকারের মত। কিন্তু সরলীকরণ আমাদের প্রিয়; জটিল ব্যাখ্যার ধৈর্য আমাদের অল্প।
ফলত কেহ কেহ মনে করেন, বিশ্ব থেকে মুখ ফিরাইয়া থাকাই ধর্মরক্ষা। বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে সন্দেহের চোখে দেখা যেন এক প্রকার ঈমানের প্রমাণ। পৃথিবী যখন মহাকাশে অভিযান চালায়, তখন আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি এবং বলি, এ সব দুনিয়ার কারবার। মুমিনের কাজ নয়। যেন ইহকাল অন্যের, পরকাল আমাদের। উইলিয়াম গবেষণাগারে প্রবেশ করিবে, আর আব্দুল কেবল তসবিহ গণিবে। এ এক আশ্চর্য বণ্টননীতি। পৃথিবীর প্রাপ্য ত্যাগ করিয়া স্বর্গের অগ্রিম কিস্তি তুলিবার আয়োজন।
কিন্তু ইতিহাসের পাতা খুলিলে দেখা যায়, ধর্মীয় কঠোরতা কোনো এক সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র সম্পদ নহে। দ্বিতীয় বিবরণ ৭ অধ্যায় ২ হইতে ৪ পদ পর্যন্ত কেনানীয়দের সঙ্গে চুক্তি ও বিবাহ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ আছে। সেখানে যুক্তি একটিই, ধর্মীয় আনুগত্যের সুরক্ষা। প্রাচীন ইসরায়েল আশঙ্কা করিত, ভিন্ন বিশ্বাসের সহিত মিশিলে নিজের বিশ্বাস দুর্বল হইবে। সেই আশঙ্কা ইতিহাসের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে বোধগম্য।
কিন্তু বর্তমান যুগে ইহুদি রাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতির সক্রিয় অংশ। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতায় তাহারা নানা জাতির সহিত সম্পর্ক স্থাপন করে। শাস্ত্রকে ইতিহাসের আলোকে পাঠ করিবার অভ্যাস তাহাদের আছে। আমরা অনেক সময় ইতিহাসকে শাস্ত্রের সংকীর্ণ পাঠের মধ্যে আবদ্ধ করিতে চাই। ফলত নিজেদের জন্যই গড়ি বিচ্ছিন্নতার দেয়াল।
বিস্ময়ের বিষয়, আরব ও ইহুদি উভয়েই সেমেটিক ভাষাপরিবারভুক্ত। ইবরানি ও আরবি ভাষা সহোদরী। উভয়ের ঈশ্বর একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক ঐতিহ্যের ধারক। তবু রাজনৈতিক সংঘাত ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার টানাপোড়েনে সেই নৈকট্য বিস্মৃত। মানুষ মানুষকে নয়, স্লোগানকে চিনিতে শিখিয়াছে।
প্রশ্ন উঠিতেছে, একবিংশ শতাব্দীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আত্মবিচ্ছিন্নতা আদৌ সম্ভব কি। আপনি যখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হন, তখন আপনি ইতিমধ্যেই বিশ্বসংলাপের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে মুখ ফিরাইয়া থাকা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনা। ধর্ম যদি সত্য হয়, তবে সে জ্ঞানের প্রতিদ্বন্দ্বী নহে। বরং জ্ঞানচর্চাকে নৈতিকতা প্রদান করাই তাহার কাজ।
মুমিন যদি দৃঢ়চিত্ত হন, তবে তিনি কর্মক্ষেত্রে, গবেষণাগারে, রাষ্ট্রচিন্তায় নিজের স্বাক্ষর রাখিবেন। চাঁদে পদার্পণের জন্য বিশেষ পদবি প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন অধ্যবসায় ও বিজ্ঞানমনস্কতা। ঈমান যদি ভয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে প্রতিবেশীর ছায়াতেই সে কাঁপিবে। আর যদি আত্মবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মহাকাশেও তাহার কম্পন হইবে না।
অতএব মূল প্রশ্ন ইহুদি বা নাসারা নহে। প্রশ্ন আত্মসম্মান ও কর্মপ্রবণতার। ধর্মকে অজুহাত করিয়া জনবিচ্ছিন্নতা লালন সহজ, কিন্তু জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কঠিন। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কঠিন পথের পথিককেই সম্মান করে।
বোরহান আজমীর
০৪/০৩/২০২৬
খুলনা