20/08/2026
#তুমি_ছিলে_আমার_গল্পে
Rakib Ahmed
অধ্যায় ১: দুই বন্ধুর অটুট বন্ধন
ভোরের প্রথম আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। গ্রামের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজান, শিশিরভেজা সবুজ ঘাস আর পাখিদের কিচিরমিচির ডাক যেন প্রকৃতিকে এক অনন্য সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলেছে। এমনই এক শান্ত গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন দুই বন্ধু—জলিল ও আব্দুল্লাহ।
একই পাড়ায় জন্ম, একই স্কুলে পড়াশোনা, একই মাঠে খেলাধুলা আর একই স্বপ্ন নিয়ে বড় হওয়া—তাদের বন্ধুত্ব ছিল রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর। গ্রামের মানুষ মজা করে বলত, “একজনকে দেখলে আরেকজনকে খুঁজতে হয় না, কারণ তারা সব সময় একসঙ্গেই থাকে।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন বদলাতে শুরু করল।
জলিল ছোট একটি ব্যবসা শুরু করলেন। খুব বড় কিছু নয়, বাজারের এক কোণে কাপড় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। আয় কম হলেও সৎভাবে চলতেন তিনি। স্ত্রী আর দুই ছোট্ট মেয়ে অদিতি ও জান্নাতকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসারে অভাব থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না।
অন্যদিকে আব্দুল্লাহ স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, ভদ্র ও ধর্মপরায়ণ মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন, মিথ্যা কথা বলতেন না, অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করতেন না। গ্রামের মানুষ তাকে শুধু শিক্ষক নয়, একজন আদর্শ মানুষ হিসেবেও সম্মান করত।
আব্দুল্লাহর সংসারও ছিল ছোট্ট। স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে আদনানকে নিয়েই তার পৃথিবী। আদনানের বয়স তখন মাত্র চার বছর। চঞ্চল হলেও ছেলেটি ভীষণ ভদ্র ছিল। স্কুল থেকে ফিরে আব্দুল্লাহ তাকে কোলে বসিয়ে গল্প শোনাতেন, কখনো অক্ষর শেখাতেন, কখনো আবার গ্রামের মাঠে হাঁটতে নিয়ে যেতেন।
প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হলে আব্দুল্লাহ বাজারে এসে জলিলের দোকানে বসতেন। দোকানের সামনে একটি পুরোনো কাঠের বেঞ্চ ছিল। সেখানে বসে দুজন গরম চা খেতে খেতে জীবনের নানা গল্প করতেন।
একদিন আব্দুল্লাহ হেসে বললেন,
“জলিল, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী জানিস?”
জলিল হেসে উত্তর দিলেন,
“টাকা?”
“না।”
“তাহলে জমি?”
আব্দুল্লাহ মাথা নেড়ে বললেন,
“মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো একজন সত্যিকারের বন্ধু। টাকা হারালে ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত বন্ধু হারালে সেই শূন্যতা আর পূরণ হয় না।”
জলিল মুচকি হেসে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তাহলে আমি তো অনেক ধনী। কারণ তোর মতো বন্ধু আমার আছে।”
দুজনেই হেসে উঠলেন।
কিন্তু সুখের দিন চিরকাল থাকে না।
হঠাৎ করেই বাজারের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। জলিলের ব্যবসায় বিক্রি কমে গেল। ধারদেনা বাড়তে লাগল। একসময় এমন অবস্থা হলো যে দোকানের কর্মচারীদের বেতন দিতেও তাকে কষ্ট করতে হচ্ছিল।
রাতে বাড়ি ফিরে তিনি স্ত্রীর সামনে হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করতেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ছিলেন।
একদিন বিকেলে দোকান বন্ধ করে চুপচাপ বসে ছিলেন তিনি। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে শুধু হতাশা।
ঠিক তখনই আব্দুল্লাহ এসে পাশে বসলেন।
“বন্ধু, কী হয়েছে?”
জলিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“মনে হয় আর পারব না। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
আব্দুল্লাহ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
“তুই কি আমার ওপর ভরসা রাখিস?”
“অবশ্যই রাখি।”
“তাহলে শুন। আমি চাই তুই শহরে গিয়ে ব্যবসা শুরু কর। গ্রামের বাজার ছোট। তোর মেধা আর পরিশ্রমের জন্য বড় জায়গা দরকার।”
জলিল অবাক হয়ে বললেন,
“শহরে যাব? কিন্তু পুঁজি কোথায়?”
আব্দুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন,
“যতটুকু সঞ্চয় করেছি, তা তোকে দেব। এটা ধার নয়, বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো। তুই সফল হ, এটাই আমার চাওয়া।”
জলিল হতভম্ব হয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল।
“তুই নিজের সংসারের কথা না ভেবে আমাকে টাকা দিবি?”
আব্দুল্লাহ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
“রিজিকের মালিক আল্লাহ। মানুষের উপকারে যা ব্যয় করা হয়, তা কখনো নষ্ট হয় না।”
সেদিন সন্ধ্যায় দুই বন্ধু অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে রইলেন। অস্তগামী সূর্যের আলো তাদের মুখে পড়ছিল, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছিল না। নীরবতার মাঝেই যেন জন্ম নিচ্ছিল এমন এক সিদ্ধান্ত, যা বদলে দেবে তাদের জীবন, তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং একদিন দুই তরুণ-তরুণীর ভাগ্যও।
জলিল বাড়ি ফিরে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। রাতের খাবারের পর স্ত্রীকে সব খুলে বললেন। অনেক আলোচনা শেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন—ঝুঁকি নিতেই হবে।
কারণ কখনো কখনো নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটতে হলে পরিচিত মাটির মায়া ছেড়ে অচেনা পথে পা বাড়াতে হয়।
চলবে