11/05/2026
Deutschebahn (DB) বা জার্মান রেলওয়ে: ন্যাশনাল প্রাইড থেকে ন্যাশনাল সাফারিং: পর্ব ১:
গত রবিবার বুয়েটের এক সিনিয়র ভাইয়ের (বর্তমানে বুয়েটের প্রফেসর) সাথে বিকেলে ফ্রাঙ্কফুর্টের এক রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করছিলাম। তিনি IEEE পলিসি মেকিং গ্রুপের একটি মিটিংয়ে এটেন্ড করার জন্যে জার্মানি এসেছেন। বাংলাদেশের এবং জার্মানির উপর অনেক টপিক নিয়েই খোলামেলা আলোচনা। বুয়েটের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে উনি বললেন, আমরা আসলে পরিবর্তন বা ইম্প্রোভমেন্ট যেটা চাই, সেটি কেউই তেমন করতে পারি না। দায়িত্বে না থেকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি অনেক, কিন্তু দায়িত্বে যাবার পর খুব কম মানুষই পারি সিস্টেমের পরিবর্তন করতে। দায়িত্বে থেকে তিনিও করতে পারেননি অনেক অনেক আগে থেকে চলতে থাকা বুয়েট বা বাংলাদেশের অনেক সিস্টেমের পরিবর্তন।
পরের দিন সোমবার সকালে তিনি যাবেন বার্লিন। সেখান থেকে পর্তুগালের আরেকটি মিটিং ধরবেন অন্য ফ্লাইটে যেয়ে।
জিজ্ঞেস করলাম, ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বার্লিন কিভাবে যাবেন। বললেন, ফ্লাই করে। জিজ্ঞেস করলাম, ট্রেনে না কেন? বললো, শুনেছি জার্মান ট্রেন নাকি ঠিক টাইম মত চলে না। সেজন্যে। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বলত দেখি, জার্মানির মত উন্নত একটি দেশের ট্রেনের অমন বদনাম কেন। অমন বদনাম গুছানোর জন্যে তোমরা কি করছ? উত্তর দিলাম, ওই যে আপনি বলছিলেন না যে, দায়িত্বে না থেকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা যেমন সহজ, দায়িত্ব নিয়ে পরিবর্তন করা অনেক অনেক কঠিন। জার্মানিতেও ব্যাপারগুলি অনেকটা অমনি।
আমি জানি, জার্মানিতে থাকা আপনাদের অনেকেরই DB এর প্রতি সীমাহীন অভিযোগ।
তারপর বললাম আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে দেখা জার্মানির রেলওয়ের বা DB এর সমস্যাগুলির কারণ।
কি কি মূল কারণ (একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত):
১. অনেক পুরাতন ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং কন্ট্রোল সিস্টেম: জার্মানির বর্তমান ট্রেন লাইন এবং কন্ট্রোলিং সিস্টেম (যেমন, ট্র্যাক বানানোর পয়েন্ট মেশিন, ট্রেন ডিটেকশন সিস্টেম, পাওয়ার সাপ্লাই, সিগন্যালিং, লেভেল ক্রসিং, কন্ট্রোলিং সিস্টেম ইত্যাদি) অনেক বছরের পুরাতন যেগুলি ঠিক মতো রিনোভেশন করা হয়নি বিগত কয়েক দশক ধরে। যার ফলে, ঘন ঘন নষ্ট এবং ট্রেন ক্যানসেল বা ডিলে।
২. পলিটিকাল কারণ: বিগত সরকারগুলি কেউই রেলওয়ে মডার্নাইজেশন এর জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। জার্মানির প্রচন্ড শক্তিশালী অটোমোটিভ সেক্টর যেমন মার্সিডিস-বেঞ্জ, বিএমডাব্লিউ, পরশে, অডি এদেরও নিজেদের অনেক লবি থাকে সরকারগুলিতে যারা হয়তো চায়নি ট্রেন উন্নতি করুক। ট্রেন উন্নতি করলে তাদের গাড়ি মানুষ কম ব্যবহার করবে। এজন্যে তারাও ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি ফ্যাক্টর হয়ে থাকতে পারে। দুনিয়াটা চালায় আসলে লৰিষ্টরাই।
৩. জার্মানির প্যাসেঞ্জের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়া: গাড়ির তেলের খরচ বেড়ে যাওয়া, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, কম দামের deutschland টিকেট চালু, শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে প্যাসেঞ্জের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে। ২০১৫ সালের দিকে প্রায় এক মিলিয়ন সিরিয়ান রিফিউজি, ২০২২ সালের দিকে কয়েক মিলিয়ন ইউক্রেনিয়ান রিফিউজি জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছে। তারা জার্মানিতে অলমোস্ট সব কিছু ফ্রি পায় এবং অনেক জায়গার প্রায়োরিটি পায়। ফ্রি পেয়ে সারা দিন ঘুরাঘুরি করতে পারে অনেকেই। ট্রেন লাইনের ক্যাপাসিটি না বাড়িয়ে ট্রেনের পরিমান অনেক বাড়ানো হয়েছে। ক্যাপাসিটির ম্যাক্সিমাম ট্রেন চালানোর ফলে ঘন ঘন বিভ্র্রাট এবং ডিলে হয় ট্রেনের।
৪. সংস্কার কার্যক্রম: অনেক লাইনের সংস্কার চলমান থাকায় ঐসব লাইনে ট্রেন চালানো ব্লক করা থাকে। এর প্রেসার অন্য সব লাইনে পরে।
৫. সোশ্যাল, গণতন্ত্র, ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন, অটোমেটেড: এসব করতে না পাড়ার কারণেও ট্রেন ঠিক সময় মতো চলতে পারেনা।
এ কারণগুলির বিস্তারিত পরের লিখাতে আমি তুলে ধরবো।
৬. অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ: জার্মানির পাশের দেশে রেলওয়ের ডেভেলপমেন্টের জন্যে প্রতি বছর দেশের জনসংখার জন প্রতি বাজেট অনেক বেশি। যেখানে অস্ট্রিয়াতে এটি ৩৫০ ইউরো, সুইজারল্যান্ডে প্রায় ৫০০ ইউরো, সেখানে জার্মানীতি মাত্র ২০০ ইউরোর মতো জনপ্রতি বাজেট রেলওয়ের জন্যে।
(চলমান .... নেক্সট পর্বে সমাধানগুলি নিয়ে লিখবো)