24/08/2026
পরমাণুর কেন্দ্রকে আমরা সাধারণত একটি ক্ষুদ্র গোলাকার গঠন হিসেবেই কল্পনা করি। কিন্তু প্রকৃতির এই অতি ক্ষুদ্র জগতেও সব নিউক্লিয়াস একই রকম নয়। কিছু নিউক্লিয়াস প্রায় গোলাকার, আবার কিছু নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রনের বিন্যাসের কারণে গোলাকার আকৃতি থেকে বিচ্যুত হয়। এবার লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা LHC তে এমনই এক অস্বাভাবিক নিউক্লিয়াসের আকৃতির শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। নিয়ন ২০ এর নিউক্লিয়াসের গঠন অনেকটা বোলিং পিনের মতো লম্বাটে হতে পারে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এর কোনো সরাসরি ছবি তোলেননি। নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষের পর ছিটকে বেরিয়ে আসা অসংখ্য কণার গতিবিধির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম সংকেত বিশ্লেষণ করেই এই আকৃতির সন্ধান মিলেছে।
তবে কেন একটি নিউক্লিয়াস গোলাকার নাকি লম্বাটে, তা নিয়ে এত আগ্রহ? কারণ নিউক্লিয়াসের আকৃতি শুধু তার বাহ্যিক গঠনের বিষয় নয়। প্রোটন ও নিউট্রন কীভাবে নিউক্লিয়াসের ভেতরে সাজানো আছে, তার ওপর অত্যন্ত উচ্চ শক্তির সংঘর্ষের ফলও প্রভাবিত হতে পারে। সার্নের LHC তে অক্সিজেন ও নিয়ন নিউক্লিয়াসকে প্রায় আলোর গতিতে সংঘর্ষ করিয়ে বিজ্ঞানীরা সেই প্রভাব খুঁজেছেন। এই পরীক্ষার ফল তাঁদের পরমাণুর অতি ক্ষুদ্র জগত থেকে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের পদার্থের বৈশিষ্ট্য বোঝার নতুন সুযোগ দিচ্ছে।
নিউক্লিয়াসের আকৃতি বোঝার গুরুত্ব বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, এর ভেতরে কী রয়েছে। একটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। এদের সমষ্টিকেই আমরা নিউক্লিয়াস বলি। সাধারণ অবস্থায় নিউক্লিয়াসের ভেতরে এই কণাগুলো প্রবল পারমাণবিক বলের মাধ্যমে আবদ্ধ থাকে। তাদের সংখ্যা এবং বিন্যাসের ওপর নিউক্লিয়াসের আকার ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে। ফলে নিউক্লিয়াসকে শুধু একটি ছোট গোলক হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত গঠন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানেন যে সব নিউক্লিয়াস পুরোপুরি গোলাকার নয়। কিছু নিউক্লিয়াস লম্বাটে, আবার কিছুটা চ্যাপ্টা আকৃতির হতে পারে। এর পেছনে কাজ করে নিউক্লিয়াসের ভেতরে প্রোটন ও নিউট্রনের সম্মিলিত বিন্যাস এবং তাদের পারস্পরিক শক্তি। নিয়ন ২০ এর ক্ষেত্রেও তাত্ত্বিক গবেষণা আগে থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে এর নিউক্লিয়াস উল্লেখযোগ্যভাবে বিকৃত হতে পারে। বিশেষ কিছু পারমাণবিক মডেলে এর আকৃতি অনেকটা বোলিং পিনের মতো হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু তাত্ত্বিক হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরীক্ষার মিল কতটা, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। কারণ এত ক্ষুদ্র কোনো নিউক্লিয়াসের আকৃতি সাধারণ কোনো ক্যামেরা দিয়ে দেখা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের তাই অন্য পদ্ধতি নিতে হয়েছে। LHC তে নিউক্লিয়াসগুলোকে অত্যন্ত উচ্চ শক্তিতে সংঘর্ষ করানো হয়। সংঘর্ষের মুহূর্তে নিউক্লিয়াসের গঠন কার্যত ভেঙে যায় এবং বিপুলসংখ্যক নতুন কণা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই কণাগুলো কীভাবে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে, তার মধ্যেই নিউক্লিয়াসের প্রাথমিক আকৃতির একটি পরোক্ষ ছাপ থেকে যায়।
এই পদ্ধতির মূল ধারণাটি বেশ সূক্ষ্ম। ধরুন, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া নিউক্লিয়াস পুরোপুরি গোলাকার নয়। তাহলে সংঘর্ষের সময় তার ভেতরের পদার্থও সবদিকে একইভাবে ছড়াবে না। সেই অসমতা শেষ পর্যন্ত উৎপন্ন কণাগুলোর গতিপথে প্রতিফলিত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বিপুলসংখ্যক সংঘর্ষের তথ্য একত্র করে কণাগুলোর প্রবাহে সেই নির্দিষ্ট বিন্যাস খুঁজে দেখেন। এরপর বিভিন্ন তাত্ত্বিক মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গে পরীক্ষার ফল তুলনা করা হয়।
এই গবেষণায় অক্সিজেন ১৬ এবং নিয়ন ২০ এর মতো হালকা নিউক্লিয়াস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে LHC তে সীসার মতো ভারী নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ ব্যবহার করে কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা হলো এমন এক অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন পদার্থ, যেখানে প্রোটন ও নিউট্রনের ভেতরে সাধারণত আবদ্ধ থাকা কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন অল্প সময়ের জন্য অনেক বেশি মুক্তভাবে আচরণ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের জন্মের কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড পর এমন পদার্থই বিরাজ করেছিল।
তবে ভারী নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষে একটি জটিলতা থাকে। সংঘর্ষের পর কণাগুলোর যে সম্মিলিত প্রবাহ দেখা যায়, তার কতটা এসেছে নিউক্লিয়াসের প্রাথমিক আকৃতি থেকে আর কতটা এসেছে তৈরি হওয়া কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমার আচরণ থেকে, তা আলাদা করা কঠিন হতে পারে। হালকা নিউক্লিয়াস ব্যবহার করলে এই প্রশ্নটি আরও পরিষ্কারভাবে পরীক্ষা করা যায়। তাই অক্সিজেন ও নিয়নের মতো নিউক্লিয়াস নিয়ে পরীক্ষা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন কণাপ্রবাহের সংকেত পেয়েছেন, যা নিয়ন ২০ এর বিকৃত আকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে নিয়ন ও অক্সিজেনের সংঘর্ষের ফলের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা গেছে, তা নিউক্লিয়াসের নিজস্ব জ্যামিতির প্রভাবের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের আকার শুধু তাত্ত্বিক মডেলের বিষয় নয়, তার প্রভাব সংঘর্ষের পর তৈরি হওয়া কণার গতিতেও ধরা পড়তে পারে।
এই ফলের পেছনে আগের গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মডেল ব্যবহার করে আগে হিসাব করেছিলেন, নিয়ন ২০ এর মতো বিকৃত নিউক্লিয়াস সংঘর্ষে কী ধরনের কণাপ্রবাহ তৈরি করতে পারে। নতুন পরীক্ষার তথ্য সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য দেখিয়েছে। ফলে নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং উচ্চ শক্তির সংঘর্ষে তৈরি হওয়া পদার্থের আচরণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এটিকে নিয়ন নিউক্লিয়াসের সরাসরি ছবি বলা যাবে না। বোলিং পিনের সঙ্গে তুলনাটি আসলে নিউক্লিয়াসের জ্যামিতিক গঠন বোঝানোর একটি সহজ উপায়। গবেষকেরা সংঘর্ষের পর বেরিয়ে আসা কণার পরিসংখ্যানগত প্রবাহ বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেই ফলকে নিউক্লিয়ার গঠনের তাত্ত্বিক মডেলের সঙ্গে মিলিয়েছেন। তাই এখানে প্রমাণটি পরোক্ষ, যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ এবং পূর্ববর্তী তাত্ত্বিক হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে। নিউক্লিয়াসের প্রাথমিক আকৃতি যদি সংঘর্ষের পর তৈরি হওয়া পদার্থের আচরণকে এতটা প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে বিভিন্ন আকৃতির নিউক্লিয়াস ব্যবহার করে কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমার বৈশিষ্ট্য কতটা নিখুঁতভাবে বোঝা সম্ভব? ভবিষ্যতে বিভিন্ন হালকা নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ তুলনা করে বিজ্ঞানীরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারেন। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে নিউক্লিয়াসের গঠন এবং মহাবিশ্বের আদিম অবস্থায় থাকা অতি উত্তপ্ত পদার্থ সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরমাণুর কেন্দ্র কোনো স্থির, নিখুঁত গোলক নয়। তার ভেতরে প্রোটন ও নিউট্রনের বিন্যাস অত্যন্ত জটিল এবং সেই গঠনকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের কখনও কখনও নিউক্লিয়াসের সরাসরি দেখা নয়, বরং তার সংঘর্ষের পর ছড়িয়ে পড়া কণার আচরণ পড়তে হয়। নিয়ন ২০ এর বোলিং পিনের মতো আকৃতির এই প্রমাণ তাই শুধু একটি অদ্ভুত জ্যামিতির সন্ধান নয়। এটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিউক্লিয়াসের গঠন কীভাবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পদার্থের আচরণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সেই অনুসন্ধানেরও একটি নতুন ধাপ।
তথ্যসূত্র : CERN ও ATLAS Collaboration, 2025; LHCb Collaboration, arXiv:2509.12399.