22/05/2023
https://www.facebook.com/100068561013150/posts/557702226525140/
ভারতবর্ষের নবজাগরণের মহান মনীষা রামমোহন রায় স্মরণে
------------------------------
রামমোহন রায় ছিলেন দীর্ঘ কুসংস্কার জর্জরিত সমাজ থেকে প্রগতিশীল সমাজ গড়ার কান্ডারি। ১৭৭২ সালের ২২মে, হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে তাঁর জন্ম। গোঁড়া ও রক্ষণশীল বৈষ্ণব পরিবারে জন্মেও রামমোহনের মেধা ও বেশ জানার আগ্রহ ছিল। পিতার ইচ্ছায় সংস্কৃত ও ফার্সী ভাষায় পড়াশোনা করে দক্ষতা অর্জন করলেও, পরবর্তীতে তাঁর এই উচ্চশিক্ষাই পিতার বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দেখা দেয়। কিশোর বয়সেই যেকোনও প্রকার দেবদেবীর আরাধনায় অবিশ্বাস জন্মেছে, ইশ্বর এক- অদ্বিতীয় এই ধারণার উন্মেষ ঘটেছে রামমোহনের মনে। আদন্ত গোঁড়া পরিবার, বিশেষ করে এমন একটা সময় যখন সবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের পায়ের মাটি শক্ত করছে, ইংরেজি পাশ্চাত্য শিক্ষা তখনো এদেশে প্রবেশ করেনি- সেই সময়ে এই ধরণের মনোভাব সমাজে বিধর্মী বলেই গণ্য হত। পিতা রামানন্দ ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন, একসময় বাড়িও ছাড়তে হয় রামমোহনকে।
এই প্রথম যেন, ভারতবর্ষকে দেখতে পেলেন। কী ভয়ঙ্কর কুসংস্কার! বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ। ছ'মাসের শিশু থেকে ছিয়ানব্বই বছরের বৃদ্ধা সতীদাহর নিঃসঙ্গতা হতে বাদ পড়ত না কেউই। ঢাকঢোলের শব্দ আর ধুপ-ধুনোর গন্ধের মোড়কে স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় সহমরণের শিখায় জ্বলন্ত পড়ানো দেখে রামমোহনের চোখে জল চলে এসে যেত রাগে, দুঃখে, লজ্জায়। এছাড়াও ছিল ধর্ম-বর্ণ-জাতি বিদ্বেষ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হত নারীরা। তিনি অবাক হয়ে যেতেন যখন দেখতেন অশিক্ষায়, বঞ্চনা ও কঠোর অত্যাচার করার পর শাস্ত্রের বুলি কপচিয়ে মেয়েদের বিরাট ধর্মচর্চার নিদর্শন দেন সমাজপতিরা।
এই নৃশংসতা ও বীভৎসতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করলেন রামমোহন। ধর্মের বিভেদ মুছে সার্বজনীন মানব ধর্ম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গ্রামে এক নতুন বাড়ি তৈরী করলেন। সেখানে শাস্ত্র আলোচনা, এবং তার উপর ভিত্তি করে বই লেখা শুরু হল। যদিও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা দায়ে জন্য সেখানে একাজ বেশিদিন করা গেল না। পরে কলকাতায় চলে এলেন।
ইতিমধ্যেই রামমোহনের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারার আকর্ষণে শহরের বহু বিশিষ্ট মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। রাজা গোপীমোহন ঠাকুর, পাইকপাড়ার জয়কৃষ্ণ সিংহ, বিখ্যাত পন্ডিত হরনাথ তর্কভূষন এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। এদেরই কয়েকজনকে নিয়ে রামমোহন একটি সভা স্থাপন করলেন তার সিমলার বাড়িতে (বর্তমানে আমহার্স্ট স্ট্রিট)। এই সভায় নানানরকম আলোচনা, শাস্ত্রপাঠ হত। রামমোহনের একমেবাদ্বিতীয়ম নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক চলত। এই সভায় কোনো জাতিভেদ, সমাজভেদ ছিল না, অবারিত দ্বার ছিল সকলের জন্য। বুঝেছিলেন জ্ঞান ও বুদ্ধির দরজা সবার জন্য মুক্ত হওয়া দরকার। কিন্তু গোঁড়া ধর্মীয় পন্ডিতরা টা সহ্য করতে পারলেন না। ক্রমেই রামমোহনের বিরুদ্ধে নানা আক্রমণ শুরু হল। রামমোহনও ছেড়ে না দিয়ে সত্য ও যুক্তির ভিত্তিতে লড়াই জারি রাখলেন। শুধু তর্ক নয়, রামমোহন তার বক্তব্যের সপক্ষে বই প্রকাশ করতে শুরু করলেন। তার ফার্সী বই 'তুহ ফাৎ- উল-মুয়াহ হিদিন', 'বেদান্ত-সার', 'বেদান্তগ্রন্হ', 'খ্রীশ্চান সমাজের প্রতি আবেদন'---- চারিদিকে আগুনের গতিতে ছড়িয়ে পড়ল। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপেও তা ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি তার বন্ধু অ্যাডামকে নিয়ে নতুন ধর্মসভা 'ইউনিটারিয়ান কমিটি' গড়ে তুললেন যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল গোঁড়া খ্রীশ্চান ধর্মের সংস্কার। খ্রীশ্চান পাদ্রীরা সমস্বরে রামমোহন ও অ্যাডামের প্রতি চড়াও হলেন। ব্যাপটি মিশন প্রেসে তার বই ছাপানো বন্ধ হয়ে গেল। রামমোহন না দমে নিজে নতুন প্রেস কিনে সেখান থেকে তার বই ছাপাতে লাগলেন।
পাশ্চাত্যের রেনেসাঁর চিন্তার সংস্পর্শে এসে তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন যে, এদেশের বুকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলন করতে না পারলে এই অন্ধকার দূর করা যাবেনা। তাই ধর্মীয় সংস্কারের পথে রেনেসাঁর সূচনা করলেও শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রচলনের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। তৎকালীন অধিকাংশ মানুষ শিক্ষা বলতে ফার্সী এবং সংস্কৃতের চর্চাকেই বুঝতো। ইতিমধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা-ভাবধারার সংস্পর্শে এসে রামমোহন উপলব্ধি করেছিলেন এদেশে শিক্ষার উন্নতির জন্য ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন আশু প্রয়োজন। কারণ এই ভাষাতেই ইউরোপে নবজাগরণ এসেছে, আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম এবং বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু সেখানেও তিনি বাধা পেলেন। তাঁর ধর্মমত ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারার জন্য অনেকেই তার সাথে এই উদ্যোগে এগিয়ে আসলেন না, এবং সবথেকে বড় আশ্চর্যজনক বিষয় হল এর মধ্যে সিংহভাগ মানুষ ভারতীয়। তিনি না দমে নিজের উদ্যোগে একটি অ্যাংলো হিন্দু স্কুল তৈরী করলেন। স্কুল খোলার পর প্রথম দিকে শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।তখন ছেলে রমাপ্রসাদ, শিশুপুত্র নন্দকিশোর বসুর ছেলে রাজনারায়ণ, দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে ভর্তি করে দিলেন। আরোও দুই চারজন ছাত্র এলো। এদের কাছেই রামমোহন শোনাতে লাগলেন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা, বিভেদহীন, বিদ্বেষহীন মানব ধর্ম সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে আলেকজান্ডার ডাফ বলে এক স্কটিশ শিক্ষাব্রতী কলকাতায় এলেন। রামমোহনের সাথে আলাপ হয়ে গেল সহজেই। দুজনে উদ্যোগ নিয়ে আরো একটা স্কুল গঠনে উদ্যোগী হলেন। ডাফ এবং রামমোহনের মিলিত উদ্যোগে সেই স্কুল আজ স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত।
সেই সময় দেশে খবরের কাগজ ছিল না বললেই চলে। এ বিষয়টি রামমোহনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আগেই।এবার এবিষয়ে তিনি আগ্রহী হলেন। 'সম্বাদ কৌমুদী', 'ব্রাহ্মণ সেবধি', ফার্সী 'মিরাৎ-উল-আকবার' ইত্যাদি পত্রিকা প্রকাশ করে চললেন। এইসব কাগজে তিনি তার নতুন ধর্মমত সার্বজনীন ব্রাহ্মধর্ম, শাস্ত্রের বিভিন্ন প্রকার বিচার, নতুন চিন্তা ও আদর্শ, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি মেয়েদের উপর যে হাজার হাজার বছরের সামাজিক অত্যাচারের স্বরূপ বর্ণনা করে সেগুলির বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং প্রতিকারের দাবি, ন্যায় বিচারের জন্য জুরির প্রথা, প্রজার উপর জমিদারি পীড়নের অবসানের জন্য নতুন প্রজাসত্ত্ব আইন- এগুলো খবরের কাগজে প্রকাশ হতে লাগল। ইতিমধ্যে ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে এলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক।
বেন্টিংক এর অনেক আগেই লর্ড ওয়েলেসলির আমলে সতীদাহ প্রথা শাস্ত্র-সম্মত কিনা এব্যাপারে নিজামত আদালতের পন্ডিতদের মত চাওয়া হলে, পন্ডিতগণ শাস্ত্র উদ্ধৃত করে বলেন সতীদাহকে সমর্থন করা যেতে পারে কিন্তু তা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন। জোর করে কোনো স্ত্রীকে মৃত স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা শাস্ত্র-সম্মত নয়, বরং তা শাস্ত্র বিরোধী। আশ্চর্যের বিষয় হল এতদসত্ত্বেও একটা সভ্য-শিক্ষিত জাতি কেমন করে এই নারীহত্যায় পাশবিক আনন্দে খেপে উঠত। বড়ো বড়ো পন্ডিতরাও সহ দেশের রাজা-মহারাজারাও বাদ ছিলনা। রাধাকান্ত দেব, মহারাজা গোপীকৃষ্ণ, হরনাথ তর্কভূষন, দেওয়ান রামকমল সেন,সাংবাদিক ভবানীচরণ উপাধ্যায়ের মত মহান ব্যক্তিরা প্রাণপনে এই প্রথা বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়ে লড়াই করেছেন। রামমোহন সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য এমন সব প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন। তিনি তাঁর 'সম্বাদ কৌমুদী' ও 'প্রবর্তক নিবর্তক' এ সতীদাহের বিরুদ্ধে যুক্তি তর্ক উপস্থিত করেন। বিরোধী পক্ষও থেমে থাকেনি। ভবানীচরণের 'সমাচার চন্দ্রিকা'তে রামমোহনের মুন্ডুপাত চলছিল। তারা 'ব্রাহ্ম-সভা'র পাল্টা 'ধর্মসভা' নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। লড়াইটা হল মূলত সত্য ও যুক্তির সাথে প্রতিক্রিয়া, সংস্কার এবং অন্ধতার।
এদেশে পা দিয়েই রামমোহনের সম্পর্কে বেন্টিংক অনেক কিছু জানেন এবং বিদ্যা-বুদ্ধি, সাহস ও সত্যনিষ্ঠার জন্য রামমোহনের প্রতি বেন্টিংক শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। নানান কারণে রামমোহনের সঙ্গে বেন্টিংকের সম্পর্ক ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এদেশে আসার আগে থেকেই বেন্টিংক সতীদাহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। জ পেগস নামে একজন ইংরেজ একখানা বই লিখেছিলেন, 'ব্রিটেনের উদ্দেশ্যে সতীর ক্রন্দন'- সে বই বেন্টিংক পড়েছিলেন এবং সতীদাহের যে ভয়াবহ রূপ দেখে চঞ্চল হয়ে পড়েন। অন্যদিকে রামমোহনও বেন্টিংক আসার পূর্বেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এই নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধের দাবি জানাতে থাকেন। যারা সতীদাহের সমর্থক তারাও ''যেহেতু স্বাভাবিক ভাবেই মেয়েরা নীচু স্তরের জীব, তাদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম, তাদের কোনো মনের জোর নেই, সর্বপ্রকার বিশ্বাসের অযোগ্য তারা এবং যেহেতু শাস্ত্রের হুকুমে তারা বিধবা হয়ে সংসারের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য, সেই জন্য তাদের পুড়িয়ে মারা উচিত'' এই যুক্তি দিয়ে এই বর্বর প্রথা চালু রাখার জন্য সাওয়াল করছিল।
বেন্টিংক স্থির করলেন এদেশ থেকে সতীদাহ প্রথা তুলে দেবেন। 'সম্বাদ ভাস্করের' সম্পাদক বিখ্যাত পন্ডিত গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ সহ বহু গণ্যমান্য লোকের সমর্থনে এবং গোঁড়া রক্ষনশীলদের 'হিন্দুর ধর্ম গেল-জাত গেল--সর্বনাশ হল' চিৎকার অগ্রাহ্য করে ৪ঠা ডিসেম্বর ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়।
সতীদাহ বিরোধী আইন ছাড়াও তৎকালীন সমাজের বহু অন্ধতা, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আজীবন লড়ে গেছেন রামমোহন রায়। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত ধর্মীয় চিন্তায় আচ্ছাদিত মনকে নাড়া দেওয়ার জন্য ধর্মকে সংস্কার করে তার মূল্যবোধকে একটা মানবতাবাদী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। ধর্মকে যুক্তিহীন আনুগত্য হিসাবে না নিয়ে যুক্তির ভিত্তিতে আত্মশুদ্ধির বা নৈতিক উন্নয়নের পাথেয় রূপে গ্রহণের আহবান রেখেছিলেন। এই ছেদটাই ছিল রেনেসাঁর চিন্তাগত। তাঁর এই সংগ্রামের পথ বেয়েই আমরা পরবর্তীকালে পার্থিব মানবতাবাদী বিদ্যসাগরকে পেয়েছি।
আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির যুগে যখন আমরা দেখতে পাই পুনরায় সেই মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা। বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত সত্যকে অস্বীকার করে প্রাচীনকালের বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার প্রচারে মূল বিজ্ঞানকেই ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন সেই মহামানবের কথা স্মরণে আসে, যিনি একাকী সমস্ত প্রতিকূলতাকে বলিষ্ঠ হাতে সরিয়ে দিয়ে নবজাগরণের চেতনাকে আবাহন করেছিলেন। চিন্তায়-চেতনায় অন্ধতা ফিরিয়ে আনার এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে, এক যুক্তিবাদী বিজ্ঞানসম্মত সমাজ গড়ে তোলার শপথই হোক রামমোহনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
-------------------
তথ্যসূত্র
১. আধুনিক ভারতের রূপকার রাজা রামমোহন রায়- বিজিত কুমার দত্ত।
২. রাজর্ষি রামমোহন- শরৎ কুমার রায়।
৩. শ্রী নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের জীবনচরিত।
৪. ভারতপথিক রাজা রামমোহন-সনৎ মিত্র
৫. রামমোহন-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
৬. প্রকৃতি, চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, ব্রেকথ্রু প্রকাশনা।