08/05/2020
🙏🙏
বিশ্বকবির বন্দনায় কার রূপ? সে তো ঈশ্বর নয়!
_____জয়দেব সাহা
“আমি কখনো-বা ভুলি, কখনো-বা চলি
তোমার পথের লক্ষ্য ধরে;
তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে
যাও সে সরে।“
একজন মানুষ কি এতটা কারও প্রতি একাত্ম হতে পারে? আর সেই মানুষটা যখন কবিগুরু, তখন তো প্রশ্নটা আরও গভীর হয়। বিশ্বকবি যার আরাধনা করছেন, তার রূপ, তার অস্তিত্ব আর উপস্থিতি বিস্ময়কর হতেই হয়। নাহলে কি একজন কবি লিখলেন আর সে’ই লেখা নোবেল পেয়ে যায়? প্রশ্নটা নোবেল নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হল যার আরাধনা কবি করেছেন, তার রূপটা কেমন ছিল?
কবি কার যেন একটা প্রার্থনা করে গেছেন। বলেছেন-
“আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা,”
আবার তিনি করুন সুরে বলেছেন-
“অন্তর মম বিকশিত করো”
প্রশ্নটা হল কার কাছে এমন প্রার্থনা করা সম্ভব? আর এই প্রার্থনার সুরটাও বড় অদ্ভুত। কবি কিন্তু কিছু চেয়ে নেননি। নিজেই করতে চেয়েছেন সব, শুধু একটা আশ্রয় আর ভরসা চেয়েছেন। চেয়েছেন মানস অনুপ্রেরণা।
১
কবির সমস্ত কবিতাগুলোতে একটা উপলব্ধি ছেয়ে আছে। এই উপলব্ধি তথা বোধ একদিনের নয়- এ নিয়ে কোন সংশয় নেই। তিনি যখন মাথানত করছেন তখন তার সামনে প্রকৃতির একটা বিস্ময় রূপ ফুটে উঠছে। ঠিক মহাভারতের যুদ্ধে যেমন অর্জুনের সামনে শ্রী কৃষ্ণের রূপ এসে উপস্থিত হয়েছিল। লক্ষ্য করার বিষয়টা হল সেই সময় শ্রী কৃষ্ণের কথাগুলোতেও ছিল বিশ্বের নিখিল কিছু সত্য। যেখানে প্রকৃতি তার বাহ্যিক রূপ-রস-গন্ধ হারিয়ে অথবা বলা যায় পেছনে ফেলে শক্তির অফুরন্ত একটা উৎস হয়ে উঠেছে। মহাভারত কিন্তু কোন ধর্মের প্রতীক একেবারেই না। এখানে মহাভারত একটা সাহিত্য মাত্র। যে সাহিত্যে যেমন দর্শন উঠে এসেছে, তেমনই বিজ্ঞানও। আর এই দর্শন কেবল বাহ্যিক কোন ভাবনা নয়, একটা গভীর উপলব্ধি। হজরত মহম্মদও কোরানে ঠিক একই কথাগুলোকে বলেছেন। প্রকৃতিকে একটা শক্তি, নির্ধারক আর বলা যায় সচেতনতার একটা বিশাল সম্ভার হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। কবিগুরুর গীতাঞ্জলীতেও ঠিক সেরকম কিছু একটা খুব প্রভাব বিস্তার করছে। তাহলে ভাবতেই হয় যে কোন সেই শক্তি যে বার বার কোনও না কোনও সাহিত্যিকের উপলব্ধিতে ধরা দিচ্ছে? শুধু সাহিত্যিক নয় বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও শেষ পর্যন্ত সেই উৎসটাকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই হয়ত বলেছেন-
“Everything is determined, the beginning as well as the end, by forces over which we have no control. It is determined for the insect, as well as for the star. Human beings, vegetables, or cosmic dust, we all dance to a mysterious tune, intoned in the distance by an invisible piper.”
তাহলে কি আমরা ঈশ্বরের গল্প করছি? একদমই না। সে তো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এখানে প্রকৃতির রূপ স্পষ্ট ধরা যাচ্ছে যেখানে জীবনেরও স্বাদ আছে আর আছে ব্রহ্মাণ্ডের সকল সত্যের উদ্ভাবনা। এই প্রকৃতি প্রতিদিন আমাকে-তোমাকে ঘুম থেকে জাগায় আবার ঘুম পাড়িয়েও দেয়। তবে কেমন দেখতে সে? তাহলে কবির পথ ধরেই একটু এগোনো যাক।
রবিঠাকুর বলছেন-
“নিত্যকালের উৎসব, বিশ্বের দীপালিকা, নির্বাণহীন আলোকদীপ্ত তোমার ইচ্ছাখানি।“
যদি প্রশ্ন হয়- কোন ইচ্ছার কথা বলছেন কবি, তাহলে হয়ত প্রশ্নটাই ভুল হয়ে যাবে। মহাবিশ্বের কোন কাজটা প্রকৃতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে? এখন একটা নৈরাশ্য কাজ করতে শুরু করবে! তাহলে কি আমাদের কোন অস্তিত্ব নেই? আমাদের হাঁটা-চলা এমনকি জীবনের প্রত্যেকটা ছোট-বড় সাফল্য-ব্যর্থতা, সবই কি কেউ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে? আমরা তাহলে চিন্তা কেন করছি? আমাদের ভাবনাশক্তি তাহলে ভিত্তিহীন! কবি কি একবারও তা বলেছেন? তাঁর কাছে কিন্তু প্রকৃতির স্বরূপটাই আলাদা। তিনি বলছেন-
“জানি জানি কোন আদি কাল হতে
ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে,”
আসলে আমরা একটা জীবনের স্রোতে ভাসছি, যার শুরু-শেষ সবটাই প্রকৃতি বা নেচারের কোলে। তাহলে আমরা কি নেচার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন সত্তা? এই সর্বশক্তির উৎসটা কি আমাদের বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ হয়? নাকি আমরা নিজেরাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ? আমাদের প্রতিটা কাজ, প্রত্যেক মুহূর্ত এই অসীমতারই অংশ। আমরা নিজেরাও এই শক্তির আধারের অবিচ্ছিন্ন রূপ। তাহলে যদি আমরাই সমস্ত কিছু হয়ে থাকি তাহলে কবি কার বন্দনা করছেন? সেই ইনফাইনাইট বিংনেশ-এর (infinite beingness)। আমরা তো একটা ক্ষুদ্র বিন্দু মাত্র। প্রকৃতি বলতে কিন্তু কেবল এই গাছ-পালা, নদী-পাহাড় না। আবার এদের ছাড়াও না। দূরে যে নক্ষত্রটার আলো প্রতি রাতে এসে আমাদের চোখকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, যার নাকি আজকে কোন অস্তিত্বই নেই! কয়েক লক্ষ বছর আগেই মারা গেছে, সেই তারাটিও যেমন নেচারের অংশ, তেমনই আমাদের সূর্যও। আবার যে অন্ধকার আমরা রাতের আকাশে কল্পনা করেছি, সেই অন্ধকারটাও। কয়েক লক্ষ বছর পর যে গ্রহটার জন্ম হবে, সেও গান করছে, সুর মেলাচ্ছে। কারণ সেও এই বাদ্যকারের একাংশ। আমরা সময়কে কিভাবে দেখি? দিন-কাল-তারিখের বেরাজালে। প্রকৃতির কোলে কিন্তু এই সময়টাও একটা অঙ্গ। ঐ যে বললাম আমরা এই শক্তিটার একটা ক্ষুদ্র বিন্দু, তাই এর সব রস আমরা বুঝব না। কিছু জিনিস আমাদের ছুঁয়ে চলে যাবে। সময়টাও তা’ই। টাইম তো একটা ডাইমেনশন, আরও গভীরে দেখলে এটা বোধহয় প্রকৃতির সত্তার একটা গঠন।
আইনস্টাইন যেমন “mysterious player”কে উপলব্ধি করেছিলেন, কবিও শুনেছিলেন তার সুর-
“তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।“
এই সুরটা কি আমরা শুনতে পাবো না? অবশ্যই পাব, কিন্তু তার জন্য দরকার উপলব্ধি। কোথায় গেলে সেই সুরটা বাজবে? কোথাও না নিজের মধ্যেই পাওয়া যাবে। নিজের ভেতর থেকেই উঠবে সেই প্রতিধবনি। কিন্তু আমরা নিজেকেই তো ভুলিয়ে রেখেছি। কখনও খুঁজতেই চাইনি আত্মস্বরূপ! তাই হয়ত বিশ্বকবি শুনলেন আর আমরা মুখিয়ে থাকলাম।
তিনি বলেছেন-
“আমার মুক্তি ধুলোয় ধুলোয় ঘাসে ঘাসে।।..... ...... ......
আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,”
কথাটা হয়ত রবির নয়, প্রকৃতির। সর্বশক্তির উৎসটা এভাবেই সবার মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। ভাগ হয়ে আছে বলাটা হয়ত ভুল হবে, সবার মধ্যে বেঁচে আছে। আমরা যে কথাগুলো ভাবছি, সেটাও তো প্রকৃতির ভাবনা; কেননা আমরাও তো একটা অংশ তার।
২
এই মহাবিশ্ব পরিচালনার দায়িত্ব কার? তাহলে একটু বিশ্লেষণ করতে হয়। ধরা যাক আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। ঐ সময় আমাকে পরিচালনার দায়িত্ব কার- আমার পায়ের, হাতের মাথার নাকি অন্য কোন অঙ্গের? নিশ্চয় কোন নির্দিষ্ট অঙ্গের নয়, বরং সমস্ত অঙ্গের মিলিত কাজ এটা। সবগুলোরই সমান অংশদারিত্ব। তাহলে মহাবিশ্বকে কে পরিচালনা করবে? নিশ্চয় বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না যে প্রকৃতির ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সমস্ত অংশের দায়িত্ব এটা। দায়িত্ব বলা ভুল হবে, এটা তো আমাদের কাজ যে কাজটাই আমরা সারাক্ষণ করে যাচ্ছি। আমদের ছোট ছোট ভাবনাগুলোও নেচারের ভাবনার একটা অংশ কারণ আমরা যে নিজেরাই নেচারের একটা অংশ। কিন্তু তারপরও প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ সবটাই আমাদের কাছে শুধু অচেনাই নয়, বিস্ময়করও। রাতের আকাশের ওপাড়ে কোন যে অন্ধকারের দেশ গুনগুন করে গান করেই চলেছে আমরা জানিনা। সূর্যের আলোর দিগন্তে কোন তারা তার রাজত্ব চালাচ্ছে! দূর মহাকাশ তো অনেক দূরের ঘটনা। সময় স্রোতটাই তো আমাদের ভাবিয়ে তুলে। যেভাবে সময়ের স্রোত প্রবাহিত হতে হতে সবকিছু বদলে রেখে দেয়! একটা সভ্যতা ধ্বংস হওয়ার সময় জানেনা পরের দিনের সূর্য কোন সাম্রাজ্যকে জন্ম দেবে! আমরা না ইতিহাসটা দেখতে পাই না ভবিষ্যৎটা। যেটা দেখতে পাই সেটাকে বর্তমানের নাম দিয়ে খনন করতে থাকি নিজেদের কারুকার্য যেন এই কার্যকলাপটা ভবিষ্যতের ডায়েরিতে ইতিহাস হয়ে থাকে।
প্রকৃতির সমগ্র সত্তাটার কিন্তু এই সমস্ত কিছুর ওপরই প্রভাব। সময় আমাদের কাছে একটা বিস্ময়, কিন্তু তার কাছে কেবলই একটা অংশ। নিজের সত্তারই একটা অংশ যা দিয়ে সে চতুর্থ ডাইমেনশনে ছবি আঁকে।
কবিগুরু বলছেন-
“বিশ্বে তোমার লুকোচুরি,
দেশ-বিদেশে কতই ঘুরি,
এবার বলো, তোমার মনের কোণে
দেবে ধরা, ছলবে না।“
কবিও খুজছেন তার সম্পূর্ণ সত্তাটাকে। কিন্তু ধরা দিচ্ছে না সে। নাকি আমরা আমাদের এই সামান্য অস্তিত্ব দিয়ে ধরতেই পারব না তাকে? সে কি সত্যিই কোথাও লুকিয়ে? না, একেবারেই না। প্রকৃতি তার সমস্ত গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। শুধু আমাদের সাধ্য হচ্ছে না সেটাকে সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করার। নদীর তিরে বসে যেভাবে গ্রাম্যবধুরা আগে কলসিতে করে জল ভরত, ঠিক সেভাবেই আমরাও জল ভরছি, জ্ঞানের জল, সেই অসীম শক্তিতাকে জানার জল। কিন্তু প্রতিদিন কলসি ভরার পরও যেমন নদীর সব জল ভরা হয়না, সেভাবেই হয়ত আমাদের জানাটাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রবিঠাকুর বলছেন-
“আর নাই রে বেলা, নামল ছায়া
ধরণীতে ,
এখন চল রে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।“
পরমানুর নিউক্লিয়াসের ভেতর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাটার মধ্যেও সেই শক্তিটা বিরাজমান যার নাম আমি ‘প্রকৃতি’ জানি। আবার মহাকাশের অনন্ত সাম্রাজ্য পেরিয়ে কোন একটা মুহূর্তেও সেই একই রুপখানি হাসছে, গান করছে, সুর লিখছে। আমরা শুধু খুঁজেই চলেছি, খুঁজেই চলেছি। বৃষ্টির ফোটার মধ্যেও যেমন তার রূপ, আবার বাষ্পের মধ্যেও; দূর কোন নক্ষত্রের মধ্যে ফুটতে থাকা লাভার মধ্যেও। কবি কিন্তু তাঁর স্বাদটা পেয়েছিলেন। হারিয়ে গিয়েছিলেন তার মাধুর্যে, তার চেতনায়, তার উপলব্ধিতে। তার গানে গলা মিলিয়ে গাইতে চেয়েছিলেন মহাবিশ্বের কোন এক চিরসত্য আওয়াজ। যে আওয়াজটা ঈশ্বরের নয়। কেননা ঈশ্বরের সত্তা তো আমরা তৈরি করেছি। এই শক্তিটা আমাদের গড়ে তুলেছে, আবার বলা যায় এই শক্তির একটা অবিচ্ছিন্ন অংশ থেকে আমরা তৈরি হয়েছি। যার কোন রূপ নেই, অবস্থান নেই। কারণ সে নিজেই অবস্থা তৈরি করে। যার কোন গন্ধ নেই, কারণ সে তার ল্যাবরেটারিতে গন্ধ তৈরি করেছে আবার তার ভাষা গবেষণাগারে এই নামটাও দিয়েছে। এই রূপহীন, গন্ধহীন, বর্ণহীন অস্তিত্বটার জন্যই কবি ব্যকুল হয়েছেন। কবির কবিতাগুলোতেও ফুটে উঠেছে তাকে খোঁজার নেশা, মাতোয়ারা রূপ আর না পাওয়ার বেদনা। অবশেষে কবির উপলব্ধি! উপলব্ধির নয়ন দিয়ে শেষমেশ তিনি খুঁজে পেয়েছেন সেই অস্তিত্বকে। হ্যাঁ তার আর কোনও নাম বোধহয় দেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। সে তো কেবলই অস্তিত্ব মাত্র। সেই পরম শক্তির অন্তরে বিশ্বকবি নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছেন-
“তোমারি মুখ ওই নুয়েছে,
মুখ আমার চোখ থুয়েছে,
আমার হৃদয় আজ ছুঁয়েছে
তোমারি চরণ।“
আবার তিনি বলছেন-
“আমি হেথায় থাকি শুধু
গাইতে তোমার গান,
দিয়ো তোমার জগৎসভায়
এইটুকু মোর স্থান।“
JOYDEB SAHA
3rd YEAR
রবীন্দ্র জয়ন্তীর শুভেচ্ছা
#পাণ্ডুলিপি ২০২০