09/04/2025
কী যুক্তি, প্রযুক্তি
AI জাদুকরের অন্দরমহল: যন্ত্র শেখে কী করে?
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI নিয়ে কতই না কথা বললাম। সে ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, আমাদের হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দেয়। আজ বলবো, এই যন্তর-মন্তর জাদুকর তার জাদুটা শেখে কোত্থেকে? তার কি আালাদিনেব প্রদীপের মতো কোনো দৈত্য আছে, যে সব উত্তর কানে কানে বলে দেয়?
AI-এর এই ‘বুদ্ধিমান’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা অনেকটা মানবশিশুর বেড়ে ওঠার মতো। ধাপে ধাপে, অভিজ্ঞতা থেকে সে শেখে। এই শেখার পেছনে আছে কয়েকটা মূল কারসাজি।
১. জ্বালানি হলো ডেটা (Data): জ্ঞানসমুদ্রের ডুবুরি
যেকোনো কিছু শিখতে গেলে যেমন বইপত্র বা তথ্যের দরকার, AI-এরও তাই। তার ‘বই’ হলো ডেটা। কোটি কোটি ডেটা! এই ডেটা হলো তার জ্বালানি।
তো, এই ডেটা আসে কোথা থেকে?
এই ডেটা সংগ্রহের জন্য AI-এর নির্মাতারা ইন্টারনেটের জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দেয়। উইকিপিডিয়া, লক্ষ লক্ষ বই, খবরের কাগজ, ব্লগ, গবেষণাপত্র, সামাজিক মাধ্যম, এককথায় ইন্টারনেটে থাকা প্রায় সমস্ত লেখা আর ছবি শুষে নেওয়া হয়। এই কাজটা করে স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম, যারা ডিজিটাল পোকার মতো দিনরাত ডেটা সংগ্রহ করে চলেছে। এই বিশাল ডেটা ভান্ডার জমিয়ে রাখা হয় গুগল, মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিদের বানানো এলাহি কারবারের সব ডেটা সেন্টারে।
যন্ত্র কি বাংলা-ইংরেজি বোঝে?
না। কম্পিউটার ‘পানি’ বা ‘water’ কিছুই বোঝে না, সে বোঝে শুধু সংখ্যা। তাই সংগৃহীত প্রতিটি শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে এক বিশেষ গাণিতিক পদ্ধতিতে সংখ্যায় রূপান্তরিত করা হয়। এই পদ্ধতির কেতাবি নাম হলো ‘ভেক্টর রূপান্তর’ (Vectorization বা Word Embedding)। যার মাধ্যমে তৈরী হয় একটা বিশাল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র। সেই মানচিত্রে ‘রাজা’, ‘রানি’, ‘সম্রাট’-এর মতো কাছাকাছি অর্থের শব্দগুলো থাকবে একে অপরের খুব কাছাকাছি বিন্দুতে। আর ‘রাজা’ থেকে ‘টেবিল’ বা ‘গাড়ি’ শব্দের বিন্দুগুলো থাকবে অনেক দূরে। এই মানচিত্রে প্রত্যেকটা শব্দের যে ঠিকানা (Address), সেটাই হলো তার গাণিতিক পরিচয়। এভাবেই যন্ত্র শব্দের অর্থ ও পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে শেখে।
২. ইঞ্জিন হলো অ্যালগরিদম (Algorithm): রান্নার রেসিপি
শুধু চাল, ডাল, মশলা (ডেটা) থাকলেই তো আর পোলাও রান্না হয় না, তার জন্য একটা প্রণালী বা রেসিপি লাগে। অ্যালগরিদম হলো AI-এর জন্য সেই রান্নার রেসিপি।
অ্যালগরিদম কি প্রোগ্রাম?
ঠিক প্রোগ্রাম নয়, তবে প্রোগ্রামের আত্মা। অ্যালগরিদম হলো ধাপে ধাপে সাজানো একগুচ্ছ নির্দেশ বা যুক্তি, যা বলে দেয় ডেটাগুলোকে নিয়ে কি করতে হবে, কিভাবে ঘাঁটতে হবে, তার থেকে কিভাবেই বা জ্ঞান বের করে আনতে হবে। আর এই নির্দেশগুলোকে যখন কোনো প্রোগ্রামিং ভাষায় (যেমন Python) লেখা হয়, তখন সেটা হয়ে যায় একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম। সোজা কথায়, পোলাও রান্নার প্রণালীটা হলো অ্যালগরিদম, আর সেই প্রণালী দেখে রাঁধুনি যেভাবে রান্নার কাজটি করেন, সেটা হলো প্রোগ্রামিং।
৩. শেখার পদ্ধতি হলো মেশিন লার্নিং (Machine Learning): কানের দুল চেনার কারিগরি
শুধু ডেটা আর অ্যালগরিদম থাকলেই AI নিজে থেকে শিখে যায় না। শেখার প্রক্রিয়াটির নামই হলো মেশিন লার্নিং।
এই পদ্ধতিটা কি?
এখানে যন্ত্রকে প্রত্যেকটা কাজের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় না। বরং তাকে প্রচুর উদাহরণ (ডেটা) দেখানো হয় এবং ফলাফল কী হবে, তা বলা হয়। যন্ত্র সেই উদাহরণ আর ফলাফলের মধ্যেকার সম্পর্কটা নিজে থেকেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। ভুল করে, আবার শেখে, আবার ভুল করে। লক্ষ কোটি বার এই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ চালাতে চালাতে সে একেবারে পোক্ত হয়ে ওঠে।
এই শেখার কাজটা হয় মূলত নিউরাল নেটওয়ার্ক’ (Neural Network) ব্যবহার করে, যা আমাদের মানব মস্তিষ্কের অনুকরণে তৈরি এক ডিজিটাল জালিকা। আমাদের মাথায় যেমন কোটি কোটি নিউরন একে অপরের সাথে সংযুক্ত, এখানেও তেমনই গাণিতিক ‘নিউরন’-এর স্তর থাকে। যন্ত্র যখন শেখে, তখন এই নিউরনগুলোর মধ্যকার সংযোগগুলোকে সে নিজেই একটু একটু করে শক্তিশালী বা দুর্বল করতে থাকে।
৪. তৈরি হলো ‘মডেল’ (Model): পাকা মস্তিষ্ক
এই যে লক্ষ কোটি ডেটা ঘেঁটে, অ্যালগরিদমের দেখানো পথে, নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে দিনের পর দিন ট্রেনিং চলল, তার ফলাফল কী? ফলাফল হলো একটি ‘মডেল’।
এই মস্তিষ্ক তৈরি হলো কিভাবে?
মডেল হলো ওই ট্রেনিং শেষে তৈরি হওয়া পোক্ত বা পাকা মস্তিষ্কটা। নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতরের সংযোগগুলো যেভাবে চূড়ান্তভাবে সজ্জিত হলো, সেটাই হলো মডেল। সে এখন নতুন যেকোনো তথ্য বা প্রশ্ন পেলে তার পুরোনো অভিজ্ঞতা (ট্রেনিং) কাজে লাগিয়ে প্রায় নির্ভুল উত্তর বা সিদ্ধান্ত দিতে পারে। অনেকটা একজন দক্ষ কারিগরের মতো, যিনি বছরের পর বছর কাজ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, এখন আর তাঁকে বই দেখে কাজ করতে হয় না, তাঁর হাতেই যেন জ্ঞান কথা বলে।
৫. ফলাফল বা আসল খেল (Output): জাদুর চূড়ান্ত প্রকাশ
এই তৈরি হওয়া ‘মডেল’ বা পাকা মস্তিষ্কটাই এরপর নানা কেরামতি দেখায়:
ক. প্যাটার্ন চেনা: হাজারটা ছবির মধ্যে থেকে বিড়ালের ছবি নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করা।
খ. ভাষা বোঝা: চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-র মতো মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাষায় কথা বলা বা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা।
গ. ভবিষ্যদ্বাণী করা: আপনার পছন্দের গান বা সিনেমার তালিকা তৈরি করে দেওয়া।
ঘ. নতুন কিছু সৃষ্টি করা (Generative AI): আগে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না, এমন ছবি এঁকে দেওয়া বা আপনার হয়ে আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখে দেওয়া।
সুতরাং, সংক্ষেপে বলতে গেলে, AI কোনো জাদুমন্ত্রে তৈরি হয় না বা output দেয় না। এর পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ ডেটা, নিখুঁত গাণিতিক প্রণালী এবং অভিজ্ঞতা থেকে শেখার এক অসাধারণ ক্ষমতা, যা একটা যন্ত্রকে ধীরে ধীরে ‘বুদ্ধিমান’ করে তোলে। একে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিস্ময় বললেও ভুল হবে না!
#কী_যুক্তি_প্রযুক্তি
মুহাম্মদ শামীমুজ্জামান
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৫